সবার সংবাদ ডেস্ক:
দেশের স্বাধীনতার সুতিকাগার ঐতিহাসিক মুজিবনগর কেন্দ্রীক হওয়ায় মেহেরপুর-১ আসনটি সব দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ আসন। স্বাধীনতার পক্ষের দল হিসাবে আওয়ামী লীগ যেমন আসনটি হারাতে চায় না। তেমনি বিরোধীদলও আওয়ামীগকে রাজনৈতিকভাবে টেক্কা দিতে এই আসনটিকে নিজেদের দখলে রাখতে গুরুত্ব দিয়ে দেখে।
তাই এই আসনে কে প্রার্থী হবেন, কে জয়লাভ করে দলের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে পারবেন তা নিয়ে দলগুলোর প্রধানরা চুলচেড়া বিশ্লেষণ এবং তথ্য উপাত্ত নিয়েই এবার প্রার্থী মনোনয়ন দিবেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। কারণ সারাদেশের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণ মুজিবনগর কেন্দ্রীক মেহেরপুর—১ এই আসনটিতে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হবে আওয়ামীলীগ।
মেহেরপুর—১ আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য মনোনয়ন কে পাবেন, দলে এবং নেতাকর্মীদের কাছে কার অবস্থান কেমন, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ে কার রশি কত শক্ত, কেন্দ্রের নজর কার প্রতি কত তীক্ষ এই সমস্ত বিষয় নিয়ে অন্য সংখ্যায় সিরিজ আকারে রিপোর্ট প্রকাশ হবে। এখন ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে কোন পথে আওয়ামীলীগ দেখা যাক।
দলের অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়-এই আসনে দলীয় এমপি ও দলের জেলা সভাপতি সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আছেন। ফলে, তাকে ঘিরেই স্থানীয় রাজনীতির বলয় তৈরী হয়েছে। তবে, সামনে সংসদ নির্বাচন ঘিরে সেই বলয় ভাঙ্গতে চান দলের ক্ষুদ্ধ অংশের নেতারা। কারণ হিসাবে ক্ষুদ্ধ নেতাদের প্রতিক্রিয়া সামনে সংসদ নির্বাচনে বড় প্রভাব পড়বে স্থানীয় সরকারে বিগত বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নৌকা প্রার্থীর পরাজয় ঘটনা।
মেহেরপুরে উপজেলা, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এ সব প্রার্থীরা দলের শীর্ষ নেতাদের সমর্থনে নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বদ্বিতা করেছে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেহেরপুরে বিশেষ করে মুজিবনগরে নৌকার করুণ পরাজয় দলের নেতাদের অবস্থানকে মারাত্বকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দলে বিমাতাসূলভ এমন সিদ্ধান্তের কারণে আজ ক্ষুদ্ধ ও বঞ্চিত অংশই দলের শক্তিশালী এবং ত্যাগী নেতাদের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অংশের প্রতিক্রিয়া হলো-ডাক্তার রোগীর অনিয়ম ধরবে কিন্তু ডাক্তারের অনিয়ম ধরবে কে? গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের ভোট বেড়েছে বলছেন নেতারা। কিন্তু দলের শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব নিয়ে হয়েছে টানাটানি আর কাটাছেঁড়া। সেই সাথে হয়েছে নেতাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি আঙ্গুল তুলে কড়া সমালোচনামূলক কথাবার্তা। এতে দেখা দেখে দলে আওয়ামী লীগের ভোট বাড়লেও নৌকার ভোট বাড়েনি। কারণ নেতারা তাদের অস্তিত্বকে মজবুত করতে দলীয় আদর্শের চাইতে ব্যাক্তি আদর্শ ও শক্তি তুলে ধরে গ্রামেগঞ্জে ভোটার বা কর্মী তৈরী করেছেন।
দলের এই অবস্থার কারণে দলের অভ্যন্তরে এবং বাইরের মানুষের মুখে প্রচলিত মন্তব্য-মেহেরপুরে আওয়ামী লীগকে হারানোর জন্য, আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে মেহেরপুর আওয়ামী লীগ কোন পথে হাঁটছে সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে। চায়ের টেবিলে, আড্ডায়, অফিস আদালত পাড়ায়, পাড়া মহল্লায়, গ্রামগঞ্জের মাঁচায় সর্বত্র একই আলোচনা এবার দলীয় প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী কাকে এই আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন দিবেন?
কাকে দিলে সে দলকে সংঘটিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নেতাকর্মীরা একে অপরের ভুল খুঁজে কড়া সমালোচনা করছে নেতাদের। দলের নেতৃত্বের মধ্যে এমন তিক্ত অবস্থানের কারণে মেহেরপুর আওয়ামীলীগ এখন কারো কাছে ৩ ভাগ, কারো কাছে ৪ ভাগ আবার কারো কাছে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। তবে, গ্রুপিং বেশি হলে ফায়দা লুট হতে পারে এই আশঙ্কায় বৃহত্তর ঐক্য গড়ে বিভক্তি কমিয়ে মনোনয়ন প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে মরিয়া বঞ্চিত অংশজনেরা। ভিতরে ভিতরে এমন ঐক্য প্রক্রিয়া চললেও মনোনয়ন দৌড়ে কেউ পিছিয়ে নেই।
এই আসনে বর্তমান এমপি এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসাবে ফরহাদ হোসেন এর নাম মনোনয়ন দৌড়ে সবার চাইতে এগিয়ে আছে। তিনি দলের সভাপতিও বটে। ১০ বছরে টানা দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পেয়েছেন। তিনি মেহেরপুরকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে বড় বড় অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। সরকারীভাবে সেই সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তাবায়নের ঘোষণাও হয়েছে। যার অধিকাংশই প্রক্রিয়াধীন বা অপেক্ষমান পর্যায়ে রয়েছে। তবে, কিছু উন্নয়ন প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে, এবারও তিনিই মনোনয়ন পাবেন এমন তীব্র জল্পনা কল্পনা যেমন রয়েছে, তেমনি দল এবার সব বিতর্ক এড়াতে নতুন মুখকে মনোনয়ন দিবেন এই জল্পনা কল্পনাও রয়েছে সর্বত্র।
খোঁজ নিয়ে এবং মাঠে ময়দানের কর্মকান্ড পর্যালোচনায় জানা গেছে-বর্তমান সাংসদ এবং জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে এবার মনোনয়ন প্রত্যাশায় কোমড় বেঁধে মাঠে নেমেছেন দলের জেলা কমিটির একাধিক সহ—সভাপতি। সহ—সভাপতি এ্যাড: ইয়ারুল ইসলাম তিনি মেহেরপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসাবে এখন সরকারের উন্নয়ন বার্তা নিয়ে প্রতিদিন গ্রামগঞ্জে গিয়ে সভা সমাবেশ, আড্ডা, পথযাত্রা, উঠান বৈঠক সহ বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
একইভাবে পিছিয়ে নেয় দলের অপর সহ-সভাপতি এ্যাড: মিয়াজান আলী। তিনি দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তিনিও প্রার্থীতা ঘোষণা দিয়ে গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন জোড়ালোভাবে। দলের আরেক সহ—সভাপতি আব্দুল মান্নান (ছোট) এবার মনোনয়ন প্রত্যাশায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তৃণমূল কর্মীদের কাছে তিনি ছুটে যাচ্ছেন সরকারের উন্নয়ন বার্তা নিয়ে।
দলের জেলা কমিটির ১নং সদস্য সাবেক সাংসদ প্রফেসর আব্দুল মান্নান তিনিও মনোনয়ন দৌড়ে গণসংযোগ সহ বিভিন্ন লবিং ও রণকৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। আব্দুল মান্নান সমর্থকরা বলছেন-যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং জনপ্রিয়তা কোন অংশেই তিনি পিছিয়ে নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির ১৩নং সদস্য মেহেরপুর পৌর মেয়র জেলা যুবলীগের আহবায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন তিনি প্রার্থীতা প্রশ্নে তৃণমূলে গণসংযোগ শুরু না করলেও এবার এই আসনে দলের মনোনয়ন পেতে গোপন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। সবাই গণসংযোগ এবং কেন্দ্রীয় লবিং দু’টোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে মনোনয়ন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাদের বিপরীতে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দলের বর্তমান সভাপতি, সাংসদ ও প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।
মনোনয়ন নিয়ে দলে এবং কেন্দ্রে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সহ-সভাপতি এ্যাড: ইয়ারুল ইসলাম বলেন-সরকারের উন্নয়ন বার্তা নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছি। তবে অন্যদের মত কেন্দ্রে ছুটতে ঘনঘন ঢাকা যায় না। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। প্রতিদিন গণসংযোগ, সভা সমাবেশ নিয়ে রাজনীতির মাঠে আমি ছিলাম, আছি এবং থাকবো বলেন তিনি।
দলের অপর সহ-সভাপতি এ্যাড: মিয়াজান আলী প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা ছুটে যান। প্রতি শনিবার মধ্যরাতে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়ে এলাকায় ফিরে মাঠ চষে বেড়ান এমনটাই বললেন তার সমর্থক নেতাকর্মীরা। তাদের দাবী মিয়াজান আলী এভাবেই ভোটের মাঠ এবং কেন্দ্র দুটোই সুনিপুনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন।
এর সত্যতা স্বীকার করে এ্যাড: মিয়াজান আলী জানান-ছুটি দিন কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা আমার অনেক পুরানো অভ্যাস। দলের আরেক সহ-সভাপতি আব্দুল মান্নান (ছোট) আগামী নির্বাচন এবং কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করতে ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাসা ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে থেকে তিনি কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় ভোটের মাঠেও নিয়মিত যাওয়াআসা শুরু করেছেন। তিনি বলেন-আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে হলে সেই প্রার্থীকে সবদিক দিয়েই চৌকষ ও যোগ্য হতে হবে।
মনোনয়ন প্রত্যাশী দলের জেলা কমিটির ১নং সদস্য সাবেক সাংসদ প্রফেসর আব্দুল মান্নান তিনি সংবাদ সম্মেলন করে এবার সংসদ নির্বাচনে নিজের প্রার্থীতার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন- তিনি মনোনয়ন চাইবেন সত্য। তবে দল যাকে মনোনয়ন দিবে তিনি তার পক্ষেই কাজ করবেন। রাজনীতিতে এবং গোলটেবিলে তার অবস্থান কেন্দ্র পর্যায়ে সরব হলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন তিনি মাঠে ময়দানে গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-বয়স হয়েছে। হয়ত: এবারই তার শেষ নির্বাচন। তাই মনোনয়ন পেতে এবার তিনি সব ধরণের চেষ্টা করবেন।
মেহেরপুর পৌর মেয়র জেলা যুবলীগের আহবায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন—বিভিন্নভাবে ভোটারদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবো সত্যি। তবে, দল যাকে মনোনয়ন দিবে তারপক্ষে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে থাকবো।
ভোটাররা বলেন-দলের সভানেত্রীর হুশিয়ারীর কারণে সব প্রার্থীরাই গণসংযোগে প্রকাশ্যে সরকারের উন্নয়ন বার্তা নিয়ে বক্তব্য দিলেও গোপনে সব সম্ভাব্য প্রার্থীই তাদের কাছে নিজের পক্ষে ভোট চাইছেন। ভোটাররা বললেন- আমাদের কাছে প্রার্থীর চাইতে প্রতীক বড়। তাই নৌকা প্রতীক যিনি পাবেন, আমরা তাকেই ভোট দিব।







