সবার সংবাদ প্রতিবেদক:
মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহের প্রায় ২ কোটি টাকার টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে প্রায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২২ টাকা বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও রোগীদের দৈনিক পথ্য বাবদ ১৭৫ টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখে খাদ্যতালিকায় চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি ও ফলের পরিমাণ কমানো হয়েছে। কোনো কোনো খাদ্যপণ্যের বরাদ্দ কমেছে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত। এমনকি সকালের নাস্তা থেকে বাদ পড়েছে চিনিও।
দরপত্রের নথি, চুক্তিপত্র এবং ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত খাদ্য সরবরাহের মূল্যতালিকা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহের জন্য ২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডার আইডি ১৩০৮২৫৭ এবং প্যাকেজ নম্বর Meher/e-Tender/2026-27-GD-9-এর বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যে আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ৫৯২ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের প্রস্তাব ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ টাকা ৮৯ পয়সা। তৃতীয় প্রতিষ্ঠান মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশনের দর ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৭৪ টাকা ৬৫ পয়সা।
তবে সর্বনিম্ন দরদাতা আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়েলনেস ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের পক্ষে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাজ্জাৎ হাসান এবং ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অর্থমূল্য ১ কোটি ৯৬ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ টাকা ৮৯ পয়সা।
হিসাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতার প্রস্তাবের তুলনায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২১ টাকা ৮৯ পয়সা বেশি মূল্যে কাজটি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, কারিগরি ও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য দরপ্রস্তাবগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে সর্বনিম্ন দরদাতা যোগ্যতা বা দরপত্রের বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী দরদাতাকে বিবেচনা করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রথম দরদাতাকে বাদ দেওয়ার কারণ ও মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ দাপ্তরিক নথিতে থাকার কথা। আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
টেন্ডারের পাশাপাশি রোগীদের খাদ্যতালিকা বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও খাবারের পরিমাণ কমানো হয়েছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তালিকার সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তালিকা তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সকালের নাস্তায় ডিমের সংখ্যা একটি অপরিবর্তিত থাকলেও দাম ১২ টাকা থেকে বেড়ে ২৩ টাকা হয়েছে। প্রতিদিন দুটি কলার পরিবর্তে একটি দেওয়া হচ্ছে। কলার দাম ৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ টাকা হয়েছে। পাউরুটির দাম প্রতি কেজি ২৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২৭৫ টাকা হলেও বরাদ্দ ৮০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৭০ গ্রাম করা হয়েছে। আগের তালিকায় থাকা ১০ গ্রাম চিনিও বাদ দেওয়া হয়েছে।
দুপুর ও রাতের খাবারে সিদ্ধ মাঝারি চালের বরাদ্দ ৪০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৪০ দশমিক ৩ গ্রাম করা হয়েছে। মসুর ডালের পরিমাণ ২৫ গ্রাম থেকে কমিয়ে ১৪ গ্রাম করা হয়েছে। এদিকে চালের কেজিপ্রতি দাম ৬০ থেকে ৬৬ টাকা এবং ডালের দাম ১২০ থেকে ১৭৮ টাকা হয়েছে।
খাসির মাংসের বরাদ্দ ৭০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৬০ গ্রাম করা হয়েছে। রুই মাছ ২৩৩ দশমিক ৩৩ গ্রাম থেকে কমে ২০১ গ্রাম, সিলভার ও গ্রাসকার্প ২৮০ গ্রাম থেকে ২৪০ দশমিক ৯ গ্রাম এবং পাঙ্গাস মাছ ৩১৮ দশমিক ১৮ গ্রাম থেকে ২৭৩ দশমিক ৮ গ্রামে নেমেছে।
সবজির ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমেছে আরও বেশি। পটল, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা কলার মতো সাধারণ সবজির দৈনিক বরাদ্দ ৪৫৯ গ্রাম থেকে কমিয়ে ১৭৮ দশমিক ৫ গ্রাম করা হয়েছে। পেঁপে ১৩১ দশমিক ১৪ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৪১ দশমিক ২ গ্রাম, আলু ৫৭ দশমিক ২৫ গ্রাম থেকে ২৫ গ্রাম এবং সিম ও মিষ্টি কুমড়া ৯১৮ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৫২ দশমিক ১ গ্রাম করা হয়েছে।
তুলনামূলক হিসাবে দেখা যায়, পেঁপের বরাদ্দ কমেছে ৬৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, সিম ও মিষ্টি কুমড়ার ৬১ দশমিক ৬৪ শতাংশ, সাধারণ সবজির ৬১ দশমিক ১১ শতাংশ এবং আলুর ৫৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পাশাপাশি সয়াবিন তেলের দৈনিক বরাদ্দ ১২ গ্রাম থেকে কমিয়ে ১০ গ্রাম করা হয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে পাকা কলার দাম বেড়েছে ১৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ডিমের ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং মসুর ডালের ৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে দৈনিক ১৭৫ টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকলেও রোগীদের খাবারের পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
সচেতন মহলের মতে, বর্তমান বাজারদরে ১৭৫ টাকার বরাদ্দ দিয়ে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা কঠিন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ও দরিদ্র রোগীরা। তাঁদের দাবি, রোগীদের পুষ্টির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দৈনিক পথ্য বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
খাদ্য সরবরাহের টেন্ডার এবং খাদ্যতালিকায় পণ্যের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খান বলেন, ‘আমি এসব বিষয় দেখি না। আপনি দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরিটির সঙ্গে কথা বলেন।
সাবেক হাসপাতাল সুপার ডা. শায়লা শারমিনের সঙ্গে তাঁর নিকটাত্মীয়তার সম্পর্কের সূত্র ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুপারিশে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে টেন্ডার পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ায়েস খান বলেন, ‘আপনি শুধু সাংবাদিক পরিচয়ে ফোন দিয়েছেন বলে কথা বলছি। আমি এসব বিষয় ডিল করি না। আপনি অথরিটির সঙ্গে কথা বলেন।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নাসিম আখতার বলেন, ‘হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহসংক্রান্ত টেন্ডার প্রক্রিয়া ও চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি প্রশাসনিক কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এ-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ ও দাপ্তরিক কিছু বিষয় গোপনীয় থাকায় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া টেন্ডার অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদনের সময় আমি মেহেরপুর জেলায় কর্মরত ছিলাম না।
তিনি আরও বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর খাদ্য সরবরাহের মূল্যতালিকা পর্যালোচনা করেছি। বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মূল্য তুলনামূলক বেশি দেখার বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সরবরাহকারীকে ডেকে রোগীদের খাবারের মান ও নির্ধারিত পরিমাণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি। বাজারমূল্য বা সরবরাহমূল্য যা-ই হোক, রোগীদের খাবারের পরিমাণ ও মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না বলে জানিয়েছি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও আশ্বস্ত করেছে, আগের নির্ধারিত পরিমাণ ও মান অনুযায়ী খাবার সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না।






