সবার সংবাদ ডেস্ক:
মুক্তিযুদ্ধে মেহেরপুর-
স্বাধীনতার সূতিকাগার মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালি গ্রামের জসিম উদ্দিন ছিলেন একাত্তরের রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের একজন বীর মুক্তিকামী যোদ্ধা। একাত্তরে তিনি দ্বীপ জেলা ভোলায় মুজাহিদ বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের পরই তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মানসিক প্রস্তুতি নেন। চাকুরীস্থল থেকে ফিরে আসেন প্রানের মেহেরপুর মহকুমায়।
৮নং সেক্টরের শিকারপুর সাব-সেক্টরে অংশ নেন প্লাটুন কমান্ডার মাজিদ মোল্লার নেতৃত্বে ঝিনাইদহে জোড়া বিমান ভূপাতিত করার মিশনে,তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ধর্মদহ মাঠের সম্মুখ যুদ্ধসহ অসংখ্য সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। তন্মধ্যে অন্যতম ৮ নং সেক্টরের শিকারপুর বর্ডারে ব্যাংগাড়ি মাঠের যুদ্ধ যেখানে মেহেরপুর জেলার একমাত্র বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউল বারীসহ মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর প্রায় অর্ধশতাধিক যোদ্ধার হতাহতের ঘটনা ঘটে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে তিনি স্মরণ করেন একাত্তরের অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন প্রতিকূলতা নিয়ে।
তিনি বলেন ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে মেহেরপুর পৌছাতে তার অনেকটা সময় পার হয়ে যায়, অনাহারে-অর্ধাহারে বিস্তীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে মেহেরপুর এসে পরিবার পরিজনের দেখা মেলেনি। জন্মভূমির প্রতি ভালবাসা ও অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি প্রায় তিন শতাধিক সহযোদ্ধার সাথে ভারতের বিহারে চাকুলিয়া ট্রেনিং ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ হবার কথা থাকলেও মাত্র ২০ দিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরই ৮নং সেক্টরের শিকারপুর সাব-সেক্টরে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নিতে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসেন। আবার শুরু হয় জীবনের চরম অনিশ্চয়তা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৭৫ টাকা পেতেন খাবার খরচ হিসেবে যা ভারতের বারাকপুর সেনা ক্যাম্প থেকে সরবরাহ করা হতো, তবে সম্মুখ সমরে থাকাতে কোনদিন অনাহারে আবার কোনদিন মাত্র একবার খেয়েই তাদের দিনাতিপাত করতে হতো। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জানতেন না পরিবারের সদস্যদের আর কখনো দেখতে পবেন কি না এমন কি আদৌ তারা বেচে আছেন কি না।
মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আরও বলেন ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের পর হানাদার বাহিনীর টার্গেটে পড়ে মেহেরপুর। ১৮ এপ্রিল দুপুরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে সড়ক পথে মেহেরপুর আসার পথে বর্তমান সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামে নির্মম গণহত্যা চালায় তারা। ভীত সন্ত্রস্ত জনসাধারণ ঘর-বাড়ি ছেড়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। তখন ভারতের হৃদয়পুর, বেতাই, শিকারপুর, করিমপুর, কাচুলিয়া, বিহারসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। ভারতীয় বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশী যুব সমাজ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার সূতিকাগার মেহেরপুর হানাদার মুক্ত হয়। ৬ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনী মেহেরপুর শহরে প্রবেশ করলে অবরুদ্ধ জনগন বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে।







