সবার সংবাদ ডেস্ক:
‘বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের পালাতে দেওয়া হবে না। তাদের পালাবার পথ বন্ধ করার জন্য ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিন স্থল বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মানেকশ বেতারে বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীর সেনাপতিদের উদ্দেশে এই হুঁশিয়ারি প্রচার করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিলপত্রের চতুর্দশ খণ্ডে এর উল্লেখ আছে।
জেনারেল মানেকশ বলেন, পাকিস্তানিরা যে পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজে করে পালাতে মতলব করেছে, তা তিনি জানতে পেরেছেন। তিনি হুঁশিয়ার করেন— ‘খবরদার এরকম চেষ্টা করবেন না। যদি করেন আপনাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো তো ধ্বংস হবেই, সেই সঙ্গে আপনাদের সৈন্যরাও মারা যাবে।
মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলির উদ্দেশে এই বেতারবার্তা দেন তিনি। রাও ফারমান আলি হচ্ছেন— বাংলাদেশের অসামরিক পুতুল সরকারের সামরিক উপদেষ্টা এবং চট্টগ্রামে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর ফ্লাগ অফিসার কম্যান্ডিং। জেনারেল মানেকশর এটিই শেষ হুঁশিয়ারি। এই জেনারেল আরও বলেন, ‘আমি সৈনিকদের জীবন বাঁচাতে চাই। এজন্যই আমার হুঁশিয়ারি।’
আনন্দবাজার এসময়ে তাদের প্রতিবেদনে লিখে, ঢাকায় পাক বাহিনীর কত সেনা আছে? সে হিসাবও কেউই জানে না। জেনারেল অরোরা এদিন বলেন, ‘গোটা বাংলাদেশে ওদের চারটা ডিভিশন ছিল। আমাদের সামরিক বাহিনী আগে বলেছিল— ঢাকায় রয়েছে একটা ডিভিশন। যদি তাই হয় এবং যশোর সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে কিছু পাকসৈন্য গিয়ে সত্যিই যদি ঢাকায় আশ্রয় নিয়ে থাকে, তাহলে ঢাকায় অন্তত দেড় ডিভিশন সৈন্য রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি ওদের অত সৈন্য ঢাকায় আছে? ঢাকার লড়াই শেষ হলেই তা জানা যাবে, তার আগে নয়। ঢাকায় ওদের দূরপাল্লার ভারী কামানই-বা কত রয়েছে? বাংলাদেশে এখন পাক বিমান বাহিনীর কোনও অস্তিত্ব নেই। তাই ঢাকার লড়াইয়ে ওদের মূলত নির্ভর করতে হবে দূরপাল্লার ভারী কামানের ওপর।’
সেদিন বেতারে হুঁশিয়ারি বার্তার আগে জেনারেল মানেকশ বিশেষভাবে জেনারেল ফারমান আলির কাছে আরও একটি হুঁশিয়ারি প্রচার করেছিলেন। এতে তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে বাংলাদেশে অগ্রসরমান ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন। পাকিস্তানি সেনাপতিকে তিনি বলেন, ‘অন্যথায় আপনার অধীনস্থ সৈনিক ও নাগরিকদের জীবনহানির জন্য একমাত্র আপনিই দায়ী হবেন।’
জেনারেল মানেকশ অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাপতির উদ্দেশে আবারও বলেন, ‘আমার সৈন্যবাহিনী চার দিক থেকে আপনাদের ঘিরে ধরছে। আমি আপনার সৈন্যদের এখনই আমার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য বারবার পরামর্শ দিয়ে আসছি। সমুদ্রপথে কিংবা আকাশ পথে কোনও দিকেই তাদের আর পালাবার জো নেই। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে আপনাদের কাছে কোনও সাহায্য আসবে, সে আশাও নেই। প্রতিরোধ নিরর্থক। প্রতিরোধ করা মানেই আপনার অধীনস্থ বহু নির্দোষ সৈনিকের মৃত্যু।’
তিনি বলেন, ‘আপনার যেসব সামরিক ও আধাসামরিক লোক ইতোমধ্যে আমার বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদের জন্য আমি পূর্ণ নিরাপত্তা ও জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী সদ্ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছি। আপনারা যদি আত্মসমর্পণ করে আমার রক্ষণাবেক্ষণে না আসেন, তবে পশ্চিম পাকিস্তানি নারী-পুরুষ ও শিশুদেরও জীবন খুবই বিপণ্ন। আমি আপনার সেনা ছাউনিগুলোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট কম বল প্রয়োগ করেছি, যাতে লোকক্ষয় বেশি না হয়। কিন্তু আমি আর সময় দিতে অক্ষম। আমি আবারও বলছি, আপনারা আমার পরামর্শে কান দিন। অন্যথায় সৈন্য ও অন্যান্য নাগরিকের মৃত্যুর পুরা দায়িত্ব আপনার ওপরই বর্তাবে।’
জেনারেল মানেকশের বেতারবার্তা এদিনে প্রথমে বেলা দেড়টায় এবং আবার বিকাল ৩টায় জেনারেল ফারমান আলির উদ্দেশে আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হয়। জেনারেল ফরমন আলির উদ্দেশে প্রচারিত হুঁশিয়ারিতে জেনারেল মানেকশ বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি গুপ্তা খেয়ায় (চট্টগ্রাম) দু'টি উপকূল জাহাজ তৈরি হয়ে আছে। আপনাদের রানওয়ে অক্ষত এবং আপনাদের বিমান প্রতিরক্ষা জোরদার করেছেন। আমি আরও জানি, আপনাদের পাঁচটি বাণিজ্য জাহাজ আত্মগোপন করে আছে এবং পাইলট আর কে ৬২৩ সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ স্পিড বোটে রওয়ানা হবার জন্য তৈরি। এ অবস্থায় মোকাবিলার জন্য আমি আমার বাহিনীগুলোকে নির্দেশ দিয়েছি।’
জেনারেল মানেকশ বলেন, ‘আপনারা যদি এরকম কোনও চেষ্টা করেন, আপনাদের বাণিজ্য জাহাজগুলো তো ধ্বংস হবেই, আপনার সৈন্যরাও মারা যাবে। সৈনিকদের জীবন বাঁচাতে চাই বলেই আমার হুঁশিয়ারি।’ জেনারেল ফারমান আলি পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য ও বেসামরিক লোকজনদের বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেবার জন্য ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের সাহায্য চান বলে জানা যায়।







