গাংনীতে শিক্ষকের লাঠিপেটায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী পঙ্গুপ্রায়
টপ নিউজ মেহেরপুর

গাংনীতে শিক্ষকের লাঠিপেটায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী পঙ্গুপ্রায়

সবার সংবাদ ডেস্ক:

বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেধড়ক লাঠিপেটায় সুরাইয়া খাতুন নামের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী এখন পঙ্গুপ্রায়। মেরুদন্ডের শিরায় আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেলের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত¡াবধানে চিকিৎসা চলছে সুরাইয়ার। তবে আর্থিক অনটনের কারণে তা ব্যহত হচ্ছে।

চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পেরে সুরাইয়ার পঙ্গুত্ব বরনের আশংকায় সময় কাটছে পরিবারের। অপরদিকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উল্টো চাপ দিচ্ছে সুরাইয়ার পরিবারকে। সুরাইয়া খাতুন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার শালদহ গ্রামের দিনমজুর হাফিজুল ইসলামের মেয়ে।

একই গ্রামের এসএআরবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। বর্তমানে সুরাইয়া কোমরে বেল্ট বেঁধে কোনরকম চলাফেরা করে। কিছুক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর কোমর বেকে বসে পড়তে হয়। তাই বিছানায় শুয়েই কাটছে তার দুঃসহ সময়। লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে পড়েছে এই ছাত্রীর।

অভিযোগে জানা গেছে, মাস পাঁচেক আগে বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণি কক্ষে সহকারি শিক্ষক হামিদুল ইসলাম সুরাইয়াকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে। তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে শিক্ষক তার ঘাড় ঠেসে ধরে পিঠের উপরে লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। মার খেয়ে শ্রেণি কক্ষে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সুরাইয়া। পরে প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকরা তাকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এদিকে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার আগেই পিঠে প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভব করছিল সুরাইয়া। এক বান্ধবীর ঘাড়ে ভর করে বাড়িতে পৌঁছায়। দিন গড়িয়ে রাত পার হয়ে গেলেও যন্ত্রণা কমেনি বরং বাড়তে থাকে। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে ওষুধ সেবন করেও যন্ত্রণা কমেনি। এক পর্যায়ে পরিবার থেকে তাকে নেওয়া হয় গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী অথবা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়।

নিউরো মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ এম. আহম্মদ আলী সুরাইয়ার আঘাতের স্থানের কয়েকটি পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় উঠে আসে মেরুদন্ডের প্রধান শিরায় ক্ষত থাকার বিষয়টি। যার চিকিৎসা ব্যববহুল বলে জানতে পারে সুরাইয়ার পরিবার। এদিকে ঘটনার রাতে সুরাইয়ার অসহ্য যন্ত্রণা সইতে না পেরে সুরাইয়ার মা মোবাইলে কল দেন শিক্ষক হামিদুল ইসলামের কাছে। প্রথমে তিনি মারার কথা অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রæতি দিয়ে বিষয়টি চেপে যেতে বলেন ওই শিক্ষক। তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে সুরাইয়ার শারীরিক অবস্থা অবনতি হতে থাকে। এতে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়।

সুরাইয়ার মা লেকজান খাতুন বলেন, আমার মেয়ের উপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা কোন শিক্ষকের কাজ হতে পারে না। অমানবিক নির্যাতনে আজ সে পঙ্গু হতে চলছে। চিকিৎসা করানোর মতো সাধ্য আমাদের নেই। প্রথম দিকে শিক্ষক বলেছিলেন সব খরচ বহন করবে। এখন তিনি বিভিন্ন নেতা ধরে আমাদের হুমকি দিচ্ছেন।

এদিকে সরজমিনে বিষয়টি নিয়ে তথ্যনুসন্ধানে গেলে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ছাত্রীকে লাঠিপেটা করার বিষয়টি স্বীকার করেন সহকারি শিক্ষক হামিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুষ্টামির কারণে বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে দুইটি বাড়ি দিয়েছি। লাঠিপেটার বিষয়টি সত্য নয়। এদিকে সুরাইয়ার চিকিৎসার অর্থ জোগাড় আর শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন মহলের দরবারে ঘুরছেন তার পিতা।

এ প্রসঙ্গে সুরাইয়ার পিতা হাফিজুল ইসলাম জানান, রাজশাহীতে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে হবে বলে চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রতিদিন অনেক টাকার ওষুধ লাগছে। যা কেনা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন। তিনি বলেন, শিক্ষক যেভাবে লাঠিপেটা করেছেন তা ছাত্রীকে শাসনের মধ্যে পড়ে না। এটি অবশ্যই নির্যাতন। লাঠিপেটাকারী শিক্ষক হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার দিকে যেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে এসএআরবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক বলেন, সুরাইয়ার চিকিৎসার জন্য আমরা চেষ্টা করেছি। একই কথা জানান বিদ্যালয় পরিচালা পর্যদ সভাপতি রাইপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম সাকলায়েন ছেপু। তিনি বলেন, বিষয়টি আমি নিরসনের চেষ্টা করছি।

বিষয়টি অবগত করা হলে গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) রনী খাতুন বলেন, এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।