“না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাবো না”
মেহেরপুরে ৯দিনের যাত্রাপালা শুরু
সবার সংবাদ ডেস্ক :
‘না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাবো না’- মান্নাদের কণ্ঠে বিখ্যাত গান। কিন্তু যাত্রার আকর্ষণ এমনি যে না গিয়েও পারা যাবে না। একসময়ে টিকিট কেটে হাজার হাজার মানুষ রাত জেগে যাত্রা দেখেছে। বাংলার জনজীবনের এমনই এক অবিচ্ছেদ্য বিনোদন ছিল যাত্রা। কালপরিক্রমায় যাত্রা এখন হারানো সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখন এই পুরানো সংস্কৃতির প্রতি দর্শক আকৃষ্ট করতে বিনা টিকিটে যাত্রাপালার আয়োজন করতে হয়। মেহেরপুরে গত কয়েকবছর ধরে শীত এলেই যাত্রাপালার আয়োজন হয়। এবার ৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ৯ রাত ব্যাপী যাত্রাপালা শুরু হয়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে।
যাত্রা ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় লোকনাট্য ধারা। এগুলি প্রধানত চারঘণ্টাব্যাপী বিপুল আয়োজনের বিনোদন। উচ্চ শব্দ ও চড়া আলোর ব্যবহার এবং দৈত্যাকার মঞ্চে নাটকীয় উপস্থাপনা যাত্রার বৈশিষ্ট্য। অতি নাটকীয় ভাবভঙ্গি ও আবৃত্তির মাধ্যমে প্রায়ই যাত্রার উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি যাত্রার উন্নতিকল্পে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতার বাগবাজারে স্থাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা আকাদেমি ও ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চ। যাত্রা বাংলাদেশ, ভারতের বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, অসাম, ত্রিপুরা ইত্যাদি প্রদেশে অনুষ্ঠিত হয়। রাতের পর রাত জেগে বাংলার সাধারণ মানুষ কৃষক, তাঁতী, কামার, কুমার, জেলে দেখেছে যাত্রায় কাহিনি আর মেতেছে পালা গানের সুরে। কখনো ভক্তি, কখনো ভালোবাসা, কখনো দেশপ্রেম তাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আবার সামন্ত রাজা, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষও যাত্রা দেখেছে। জমিদারবাবু তো আর সাধারণ প্রজার সঙ্গে যাত্রার আসরে গিয়ে বসবেন না। বরং তার প্রাসাদের নাটমন্ডপেই বসবে যাত্রার আসর। জমিদারবাড়িতে থাকতো বিশাল নাটমন্ডপ। সেখানেই যাত্রা, পালাগান, কীর্তনের আসর বসতো। চিক বা পর্দাঘেরা বারান্দায় বসতেন জমিদার গৃহিনী, রানীমা, পরিবারের নারী সদস্যরা। তারা চিকের আড়াল থেকেই দেখতেন যাত্রাপালা।
শেঁকড়ের অনুসন্ধানে এক বিশুদ্ধ যাত্রাপালা নিয়মিত আয়োজনের লক্ষ্যে শিল্পকলা একাডেমী বাঁছাইকৃত ৯টি দল নিয়ে “তৃণমূল মানুষের জন্য শিল্প সংস্কৃতি” শীর্ষক যাত্রা উৎসব মেহেরপুর শামসুজ্জোহা পার্কে শুরু করেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মেহেরপুর-১ আসনের এমপি ফরহাদ হোসেন গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য যাত্রাপালার শুভ উদ্বোধর করেন। এই সময় মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মনসুর আলম খান, পুলিশ সুপার রাফিউল আলম, পিপিএম-সেবা প্রতিমন্ত্রীর সাথে ছিলেন। উদ্বোধনী দিনে আলী রেজা বিচু পরিচালিত জেলা শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীরা বেগম আসমান তারা যাত্রা মঞ্চস্থ করে। ৫ ফেব্রুয়ারী ওহিদলি ইসলাম পরিচালনায় উজলপুর সৌখিন নাট্যগোষ্টি যাত্রা অনুসন্ধান মঞ্চস্থ করে। ৬ ফেব্রুয়ারী অনুষ্টিত হবে আক্তারুল ইসলাম পরিচালিত কোলা সৌখিন নাট্যগোষ্টির যাত্রা একটি পয়সা। ৭ ফেব্রুয়ারী মনিরুজ্জামান টিটু পরিচালিত দারিয়াপুরের নটরাজ গ্রুপ থিয়েটার কলঙ্কিত মসনদ যাত্রা মঞ্চস্থ করবে। ৮ ফেব্রুয়ারী মেহেরপুর প্রান্তিক নাট্যগোষ্টির আয়োজনে এবং আসাদুজ্জামান লাল্টু পরিচালনায় যাত্রা আজকে বাবার ফাঁসির দিন মঞ্চস্থ হবে। ৯ ফেব্রুয়ারী আমঝুপি উত্তরপাড়া একতা ক্লাব মো: সাইদুর রহমানের পরিচালনায় যাত্রা জীবন নদীর তীরে মঞ্চস্থ করবে। ১০ ফেব্রুয়ারী মো: আসাদুজ্জামানের পরিচালনায় বারাদী প্রভাতি ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্টিত হবে যাত্রা শাঁখা দিওনা ভেঙ্গে। ১১ ফেব্রুয়ারী হায়দার আলীর পরিচালনায় রায়পুর জাগরনি ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্টিত হবে যাত্রা হাসির হাটে কান্না। শেষ রজনী ১২ ফেব্রুয়ারী মো; আব্দুর রাজ্জাক এর পরিচালনায় এবং গাংনী সীমান্ত অপেরা এর আয়োজনে মঞ্চস্থ হবে যাত্রা স্বামীর চিতা জ্বলছে।
যাত্রাশিল্পে মেহেরপুরের ইতিহাস অনেক বর্ণাঢ্য। মৌসুমে দেশের গুণী যাত্রাশিল্পী এবং চলচিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রীরা মেহেরপুরে আসতেন যাত্রাপালায় অভিনয় করতে। ৩০ বছর আগেও মেহেরপুরে ৫০-১০০ কিংবা ২শ টাকা টিকিট কিংবা গেটপাশ কিনে গ্রামশহরের সবশ্রেণীর দর্শকশ্রেতা যাত্রাপালা দেখতে ভীড় করতেন। পরবর্তীতে এই শিল্পের মধ্যে অভিনয়ের চাইতে অশ্লীন নৃত্যের আধিক্যতা বৃদ্ধি পেলে ক্রমে শিল্পটি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে। যাত্রাকে অশালীনতা থেকে মুক্ত করতে এবং যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে নতুন করে তৈরি হয় যাত্রা নীতিমালা। ২০১২ সালে যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। কিন্তু শিল্পটি বাঁচাতে কার্যকর কোন ভ‚মিকা না থাকায় এই শিল্পের সাথে যুক্ত শিল্পী যন্ত্রীরা আজ অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। অথচ- একসময় যাত্রা শিল্পী ও যন্ত্রীদের কদর এবং সম্মানী একটাই বেশি ছিল যে যাত্রা অভিনয়কে তারা পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিল। তখন হাজার হাজার টাকা বায়না দিতে শিল্পী আনতে হতো। তখন যাত্রাপালা করে বিভিন্ন ক্লাব সংগঠন আয় করে প্রতিষ্ঠান চালাতো। আজ এসব কথামালা। আবার যাত্রা সুস্থধারার গ্রামীণ সংস্কৃতি হয়ে জেগে উঠুক সেই প্রত্যাশা সবার।







