সবার সংবাদ প্রতিবেদক:
চলাচল সহায়তায় চাই একটি হুইল চেয়ার
ঠেলা গাড়িটি এক হাতে ঠেলে, আরেক হাতে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে চলা মানুষটির নাম সিজার। সিজার মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী এই মানুষটিই গ্রামের সবার কাছে সাহস, হাসি আর আশাবাদের প্রতীক।
হাস্যোজ্জ্বল সিজারের বয়স ৪২ বছর হলেও তার উচ্চতা মাত্র ২ ফিট। আচরণ ও সরলতায় এখনো শিশুর মতো। তবু থেমে নেই তার জীবন সংগ্রাম। ছোট্ট একটি বিয়ারিং গাড়ি হাতে ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন নিজের পথে। কষ্টসাধ্য চলাফেরাই তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ছোট্ট ঠেলা গাড়িটি নিয়েই সিজারের প্রতিদিনের যাত্রা গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। মসজিদে নামাজ পড়া, হাটে-বাজারে ঘোরা, কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ আনা আর বিকেল বেলায় পাড়ার মানুষের সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডায় মেতে ওঠেন। প্রতিবন্ধী হয়েও নিজের সব কাজ নিজেই করেন সিজার। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও মানসিক দৃঢ়তায় রান্না, ঘর গোছানো থেকে শুরু করে নিজের ব্যক্তিগত কাজ সব কিছুতেই তিনি স্বনির্ভর। জীবন তাকে ছোট করে ফেলে দেয়নি বরং তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন, দেহের উচ্চতা নয়, মানুষের বড় হওয়া নির্ভর করে তার মনের শক্তির উপর। সিজারের একমাত্র ছোট্ট চাওয়া একটি ব্যাটারি চালিত হুইল চেয়ার। হয়তো সেই গাড়িটিই তার কষ্টসাধ্য পথকে একটু সহজ করে দেবে, আর হাসির পরিধিকে আরও একটু বাড়িয়ে দেবে।
গ্রামবাসী বিভিন্ন বয়সীদের কাছে তিনি ভালোবাসার মানুষ। তার হাসিমুখ আর অকৃত্রিম আচরণ তাকে গ্রামের সবার কাছে আপন করে তুলেছে। তার হাসিমুখ ও বিনয়ী আচরণ সবাইকে আপন করে নিয়েছে।
তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই সিজারের। তার কথা অনুযায়ী, “আল্লাহ তাকে যেমন বানিয়েছেন, সেটাই সে মেনে নিয়েছে। তার কোন আক্ষেপ বা খারাপ লাগা নেই। শুধু চলাচলে খুব কষ্ট হয়। একটা ব্যাটারি চালিত গাড়ি বা হুইল চেয়ার পেলে সেই কষ্টটা আর থাকবে না।”
সিজারের মা শাহিদা খাতুন জানান, জন্মের পর থেকেই বোঝা গিয়েছিল ছেলে স্বাভাবিক নয়। ভালো চিকিৎসার আশায় দেশ বিদেশের চিকিৎসকদের কাছে নিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, অপারেশন করলে জীবনের ঝুঁকি বেশি। বুকের ধনকে হারাতে হবে তাই সন্তানকে আগলে রাখা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, “সিজার নিজের সব কাজ নিজেই করে। শুধু চলাচলের সময় খুব কষ্ট হয়। একটি ব্যাটারি চালিত হুইল চেয়ার হলে ছেলেটার জীবনটা অনেক সহজ হতো।”
সিজার বলেন, রান্না ও ঘর গোছানো থেকে শুরু করে নিজের সমস্ত কাজ নিজেই করতে পারি। মসজিদে নামাজে যায়। অবসর সময়ে একটু টিভিও দেখি। শারীরিক এই অবস্থার জন্য আমার কোন খারাপ বা কষ্ট লাগে না। আল্লাহপাক আমাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন আমি সেটাই মেনে নিয়েছি। শুধু আমার চলাচলে খুবই অসুবিধা হয়। এক হাত দিয়ে গাড়ি ঠেলতে গিয়ে হাতে অনেক সময় ক্ষত তৈরী হয় আবার অনেক সময় রাস্তায় পড়ে থাকা নোংরা লেগে যায়। ইচ্ছা থাকলেও ঠিকমত নামাজটা পড়তে পারি না। একটা ব্যাটারি চালিত গাড়ি বা হুইল চেয়ার পেলে আমার চলাচলের কষ্টটা শেষ হতো।
সিজারের এই স্বল্প-সুবিধার জীবন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের প্রতি আস্থা এবং সমাজের প্রতি ভালোবাসা মানবিক এক অনুপ্রেরণার গল্প। তার বড় প্রত্যাশা একটি ব্যাটারি চালিত হুইল চেয়ার, যা তাকে একটু স্বস্তি দেবে এবং তার চলাচলকে আরও সহজ করবে।







