মেহেরপুরে সবুজের আড়ালে নিকোটিন চাষ, প্রলোভনের শিকার তামাক চাষীরা
টপ নিউজ মেহেরপুর

মেহেরপুরে সবুজের আড়ালে নিকোটিন চাষ, প্রলোভনের শিকার তামাক চাষীরা

সবার সংবাদ ডেস্ক:

তামাক চাষ, ক্রয় বিক্রয়, তামাক পরিচর্চা ও বাছাই সব কাজই ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। তারপরও জমির জন্য চরম ক্ষতিকর চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও তেমন কারো কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনা। এ কারণে মেহেরপুরে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না তামাকের উৎপাদন ও বিপণন।

প্রতিবছর তামাক ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে নারী শিশু তামাক বাছাইয়ের কাজ করতে গিয়ে শ্বাসকষ্ট জনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শত শত হেক্টর জমি তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে। তবুও বিভিন্ন তামাক ক্রয় কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রলোভন, প্রচারণা ও প্রণোদনার কারণে চাষীরা ঝুঁকছেন এই জীবন ও মাটি ধংসকারী তামাক চাষে। সবুজের আড়ালে প্রতিটি পাতায় পাতায় নিকোটিন নিয়ে বেড়ে উঠছে একেকটি তামাকের চারা। যেন দেখে মনে হচ্ছে এক একটি চারা এক একটি জীবন ধংস করতে ধেয়ে আসছে। স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, জমির উর্বরতা ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকছেন অধিক মুনাফালোভী চাষীরা।

এদিকে চোখের সামনে তামাক চাষ হলেও তা রোধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কৃষি বিভাগ এমনি তামাক চাষে জমির ক্ষতি সম্পর্কেও কৃষককে কোন পরামর্শ দেননা এমন অভিযোগ সাধারণ চাষীদের। সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন মাঠে তামাকের চারা রোপণ করা শেষ হয়েছে। বিশেষ করে জেলার গাংনী উপজেলার বিস্তর্ণ জমিতে এবার অধিক মাত্রায় তামাক চাষ হচ্ছে। আবার কোথাও তামাক পাতা স্যাঁকার জন্য তোলা হচ্ছে চুল্লীঘর। এসব চুল্লীতে বিভিন্ন ধরনের পলিথিন ও ঝুট কাপড় পোড়ানো হয়। ফলে বিকট গন্ধে বাতাস দুষিত হয়।

গেল বছরের তুলনায় এবার বেশি তামাক চাষ হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন চাষীরা। বিভিন্ন তামাক কোম্পানীর লোকজন বিভিন্ন ধরণের প্রণোদনা দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে সার, কীটনাশক, পলিথিন ও নগদ টাকা। চাষীরা তামাক বিক্রি করে ওই টাকা পরিশোধ করে থাকেন। মোটা অংকের টাকার লোভে চাষীরা তামাক কোম্পানীর কথায় তামাক চাষ করছেন।

কুঞ্জনগরের তামাক চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তামাক চাষে লাভ বেশি। এক বিঘা জমিতে তামাক চাষে খরচ হয় ৭/৮ হাজার টাকা এবং তামাক ভালো হলে ৫-৬ মণ তামাক পাওয়া যায়। সব বাদ দিয়ে ৫০/৬০ হাজার টাকা লাভ হয়। তামাক চাষে যা কিছু লাগে তার সবই তামাক কোম্পানীর লোকজন দেয়। কৃষকের পুঁজি ব্যায়  তেমন লাগে না। ফলে তামাক চাষ অত্যন্ত সহজ।

কৃষক দাউদ হোসেন জানান, এক কোম্পানির সাথে চুক্তি হয়েছে সব খরচ কোম্পানীর। উৎপাদিত তামাক বাজার মূল্য ধরে যা দাম হবে ওনাদের খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করে তারা তামাক নিয়ে যাবে। একই কথা জানালেন শিমুলতলার চাষি মনিরুল ইসলাম ও সেকেন্দার আলী।

চাষিদের অভিযোগ, কৃষি অফিস তামাক চাষের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে না। মেহেরপুর ক্যাবের প্রেসিডেন্ট রফিকুল আলম জানান, তামাক চাষ শুধু ক্ষতিকরই না অত্যন্ত অলাভজনক। তামাক চাষের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খরচ হিসেবে করলেই তার প্রমাণ মিলে। তাছাড়া তামাকের উচ্ছিষ্ট অংশ হৃদপিন্ডে ঢুকে ক্যান্সার সহ মরণব্যাধি হতে পারে।

তামাক চাষ স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এমন প্রশ্নের জবাবে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক এমকে রেজা জানান, তামাক নানাভাবে স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। যারা তামাকের পরিচর্যা করে তারাও নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। ধুমপায়ীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে হাপানি ফুসফুসে প্রদাহ ও ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হন তারা।

গাংনী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, এবার এ অঞ্চলে এক হাজার ৫৯৪ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। আমরা বিভিন্নভাবে তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। আমরা তামাকের বদলে অন্য ফসল চাষ করার জন্য তাদেরকে বলছি। তবুও কিছু কিছু তামাক কোম্পানি কৃষকদের প্রভাবিত করছে। তবে অনেকেই তামাকের পরিবর্তে ভুট্টা আবাদে আগ্রহী হয়েছেন। আগামীতে তামাকের আবাদ অনেকটা কমে যাবে বলেও আশাবাদী তিনি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছর তামাক ক্রয় শুরু হলে এ জেলায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করে তামাক কোম্পানীগুলো। তারা চাষীকে ঠকিয়ে ভালো তামাক অল্প দামে হাতিয়ে নেয়। বিকল্প না থাকায় চাষের পর চাষীরা কোম্পানীগুলোর কাছে তামাক দিতে বাধ্য হয়। অভিযোগ রয়েছে-বৃটিশ আমেরিকা বাংলাদেশ ট্যোবাকো কম্পানী (বিএটিবি) ছাড়াও অন্য কোম্পানীগুলো ঘুষের বিনিময়ে তামাকের মান এবং দাম নির্ধারণ করায় ভালো গুন সম্পন্ন তামাক চাষী নায্য দাম পায়না। অথচ, নিম্নমানের তামাক পায় বেশি দাম। এনিয়ে প্রতি ক্রয় মৌসুমে চাষী ও কোম্পানীর মধ্যে দেখা দেয় উত্তেজনা, হাতাহাতি, মারামারির মত ঘটনা। কিন্তু কোম্পানীগুলোর জিম্মীদশা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না চাষী।