মেহেরপুরে বেড়েছে বজ্রপাতে মৃত্যু, ভয় নিয়ে কৃষকের চাষাবাদ
টপ নিউজ কৃষি সারাদেশ মেহেরপুর

মেহেরপুরে বেড়েছে বজ্রপাতে মৃত্যু, ভয় নিয়ে কৃষকের চাষাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মেহেরপুর কে বলা হয় সবজির জেলা। সারাবছর সবজী চাষ করে এই জেলার বেশীর ভাগ মানুষ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এখন বজ্রপাত আতঙ্কে সেই জেলার কৃষক জমিতে চাষাবাদ করতে গিয়ে মৃত্যু ভয়ে ভুগছে। হঠাৎ করে জেলায় বজ্রপাত ঘটনা এবং বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে এই আতঙ্ক। চলতি বছরে এখন পর্ষন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কৃষকরা বলছেন- পর্যাপ্ত নিরাপদ কৃষক ছাউনি থাকলে তারা বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সেখানে আশ্রয় নিতে পারতো। অন্যদিকে বজ্রপাত মোকাবিলায় সড়ক পার্শ্বে তালগাছ রোপনে কৃষি বিভাগের উদ্যোগ নেওয়ার দাবী করেন বিশেষজ্ঞরা। 

সবজী খ্যাত জেলা মেহেরপুরে সারাবছর নানা জাতের সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে। জেলার ৮০ ভাগ জমি কৃষি কাজে ব্যাবহার হয়ে থাকে। ইদানিং বজ্রপাত ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এই সব জমিতে কাজ করার সময় বৃষ্টির সাথে বজ্রপাত হলে কৃষকের মৃত্যু ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারন কৃষকদের মাঝে নতুন করে তৈরি হয়েছে বজ্রপাতে মৃত্যুর আতংক। ফলে আকাশে মেঘ দেখলে কৃষক কাজ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এতে কৃষির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং মাঠগুলো ফাঁকা হয়ে নিমিষেই মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। কালবির্বতনে হারিয়ে গেছে তালগাছ। আগে রাস্তার পার্শ্বে এবং বিস্তীর্ণ মাঠে ছিল তালগাছ। তালগাছ বজ্রপাতকে মোকাবিলা করতো। সেই তালগাছ কেটে জ্বালানী হিসাবে ধংস করার কারণে প্রকৃতির বৈরিতা এবং বজ্রপাত ঘটনা বেড়েছে। সরকারীভাবে বিভিন্ন মাঠে বজ্রপাত থেকে কৃষককে রক্ষায় তৈরি করা হয়েছে কৃষক ছাউনি। সেগুলোও পর্ষাপ্ত না হওয়ায় দুর্যোগে সময়ে কৃষক পাচ্ছেনা কোন নিরাপদ আশ্রয়। ফলে-মাঠে কাজ করতে গিয়ে সুস্থ শরীরে যাওয়া পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটিকে অকাতরে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে মেহেরপুর জেলায় গত দুই বছরে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ৬০ জনের। গত শুক্রবার সদর উপজেলার শোলমারী গ্রামে ধানের জমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মৃত্যু হয় দুই কৃষকের। চলতি বছরে এখন পর্ষন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। পরিবেশবিদ বলছেন- বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার থেকে বেশী মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ থেকে বজ্রপাত রক্ষায় তালগাছ সহ বড় গাছ কেটে ফেলাই ভূমিতে বজ্রপাত ঘটছে। অন্য বছরের তুলনায় এবছর মেহেরপুর জেলায় বৃষ্টির সাথে বজ্রপাত বেশী বলেও জানান তারা।  

মেহেরপুরের তেরোঘরিয়া গ্রামের কৃষক আজিম ও শামীম জানান, বর্তমানে বজ্রপাতে মৃত্যুর আতংক নতুন করে তৈরি হয়েছে আমাদের মাঝে। আকাশে মেঘ দেখলে কাজ বন্ধ করে বাড়ি বা অন্য কোথাও চলে যেতে বাধ্য হচ্ছি। এতে আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আগে বড় গাছে বা অন্য কোথাও বজ্রপাত ঘটতো এখন মাটি পড়ছে। এতে করে আমাদের ভয় বেশী তৈরি হয়েছে। আমরা মাঠে কাজ করার সময় বেশীর ভাগ সময় ভেজা মাটি ও পানির মধ্য থাকতে হয় আমাদের। তবে মাঠ গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্ষাপ্ত পরিমান বজ্রপাত রক্ষায় কৃষক ছাউনি তৈরি করলে আমাদের জন্য উপকার হতো। 

সদর উপজেলার শোলমারি গ্রামের যুবক সোহান জানান, বজ্রপাতে আমার চাচাতো ভাই মারা গেছে। তারা মাঠে ধানের জমিতে কাজ করছিলো এসময় বজ্রপাত ঘটলে ঘটনাস্থলে দুই জনের মৃত্যু হয়। পরিবারের এক মাত্র উর্পাজনক্ষম ব্যাক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা। গ্রাম পর্ষায়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় কোন ধরনের পরার্মশ দেয়নি আমাদের। 

মেহেরপুর সহিউদ্দিন ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক ও পরিবেশবিদ মাসুদ রেজা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার থেকে বেশী মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ থেকে বজ্রপাত রক্ষায় তালগাছ সহ বড় গাছ কেটে ফেলাই ভূমিতে বজ্রপাত ঘটছে। মাঠে কাজ করার সময় কৃষকদের গাছের নিচে আ¤্রয় না নিয়ে বিদ্যুৎতিক খুটির আশপাশে আশ্রয় নিয়ে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এছাড়া আকাশে মেঘ দেখলে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে চলে আসা। তাল গাছ সহ উচুঁ গাছ রক্ষায় এখুনি কৃষি বিভাগ ও বনভিাগের বড় ভুমিকা দরকার বলেও জানান তিনি। 

মেহেরপুর সদর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা চায়না পারভিন জানান, তাল গাছ রোপনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা সহ বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে কৃষককে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে। বৃষ্টির সময় কোন ভাবে পানি জমিতে কাজ না করার জন্য কৃষকদের বলা হচ্ছে। 

কিছু মাঠে সরকারী ভাবে কৃষক ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। এগুলো আরো বেশী তৈরি হলে কৃষকদের জন্য আরো ভালো হবে বলে জানান তিনি। তবে পর্ষায় ক্রমে সব মাঠে এধরনের ছাউনি তৈরির জন্য জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষি মন্ত্রাণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।