মেহেরপুর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ এর মাধ্যমে খুলছে মানবতার দুয়ার
মেহেরপুর

মেহেরপুর সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ এর মাধ্যমে খুলছে মানবতার দুয়ার

আবু আক্তার করন:

মেহেরপুর সীমান্তে খুলছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহীনির মধ্য মানবতার দুয়ার। তারকাটার ওপারে মৃত্যুর পর সীমান্তের শূণ্য রেখায় দুই দেশের নাগরিকদের শেষ বারের মত লাশ দেখার ব্যাবস্থা করছে বিজিবি ও বিএসএফ। বাংলাদেশে জন্ম হলেও বিয়ের পর পার্শবর্তী দেশ ভারতের নাগরিক হয়ে যান শুকরিতি হালসোনা। খ্রীষ্ঠান ধর্মের এই নারীর পিতা মাতা সহ আপনজনরা থাকেন বাংলাদেশের মেহেরপুরের মুজিবনগর ভবের পাড়ায় । শুক্রবার সন্ধ্যায় ভারতের নদীয়া জেলার রিদয়পুর গ্রামে স্টোক করে মারা যান তিনি। মৃত্যুর খবর এপার বাংলায় পৌছালে ভাই বোন সহ স্বজনরা শেষ বারের মত বোনের মুখ দেখার জন্য আবেদন করেন বিজিবির কাছে। সেই আবেদন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে মানবতার দেওয়াল খুলে যায়। মৃত্যুর পর কিছুক্ষনের জন্য বোনের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় কৃতজ্ঞাতা জানায় স্বজনরা। 

মেহেরপুর জেলার  তিন দিক জুড়ে ভারতীয় সীমান্ত। এই জেলার বেশীর ভাগ মানুষের ভাই,বোন, বাবা মা সহ আপনজনরা থাকেন তারকাটার ওপারে ভারতে। সীমান্তের তারকাটা দূরত্ব বাড়িয়ে রাখে স্বজনদের মধ্যে। কেউ অসুস্থ্য বা মৃত্যু বরণ করলে তারকাটার কারনে দেখা সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনা। সীমান্তরক্ষী দুই দেশের বাহিনীর মানবতায় মৃত্যুর পর শেষ বাবের মত বোন শুকরিতি হালসোনা কে দেখতে পান ভাই বোনরা। ৩০ বছর আগে ভারতের নদীয়া জেলার রিদয়পুর গ্রামে সঞ্জীব বিশ্বাসের সাথে বিয়ের পর সেই দেশের নাগরিক হয়ে যান শুকরিতি। এপারে থাকা মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার ভবের পাড়ায় শুকরিতি হালসোনার ভাই সহ আত্মীয়স্বজনরা অনুরোধ করেন বিজিবি কে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহীনির উচ্চ মহলে চিঠি চালাচালির পর মুজিবনগর সীমান্তের ১০৫ নাম্বার মেন পিলারের কাছে শেষ বারের মত বোনের মুখটা দেখোনোর জন্য তারকাটা পেড়িয়ে মরাদেহ নিয়ে আসা হয় শূন্য রেখায়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২০ মিনিট বোনের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান তারা। ভারতে বসবাসকারী স্বজনরাও বিজিবি ও বিএসএফ এর এমন মানবতায় কৃতজ্ঞতা জানান। 

এমন ঘটনা গত ১৯ নভেম্বর মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস সীমান্তে শেষ বারের মত মায়ের মুখ দেখার ব্যাবস্থা করে দেয় বিজিবি ও বিএসএফ। ২৫ বছর আগে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামের উজ্জল শেখের সাথে ভারতের মেয়ে আমিরা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সেভাবে দেখা হয়না মা মেয়ের মধ্য। মুঠোফোনে কথা বলে শান্তি খুজতো তারা। 

১৯ নভেম্বর সকালে ভারতের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার ভাতগাছি গ্রামে ভারতীয় নাগরিক ওয়াছন বিবি নিজ বাড়ীতে বাধ্যর্কজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছেন মেয়ে আমিরা খাতুন। মৃত্যুর খবরে শেষ বারের মত মায়ের মুখটা দেখার জন্য ভেঙ্গে পড়েন তিনি। ওপারে থাকা আমিরা খাতুনের ভাই সহ আত্মীয়স্বজনরা অনুরোধ করেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষি বাহীনি বিএসএফ কে। দুই দেশের সিমান্তরক্ষি বাহীনির উচ্চ মহলে চিঠি চালাচালির পর আনন্দবাস সীমান্তের ১০১ নাম্বার পেন পিলারের কাছে শেষ বারের মত মায়ের মুখটা দেখোনোর জন্য তারকাটা পেড়িয়ে মরাদেহ নিয়ে আসা হয় শূন্য রেখায়। সেখানে মেয়ে আমিরা খাতুন স্বামী সন্তান সহ কয়েকজন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ১০ মিনিট মায়ের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান।

এর আগে অনেকে চেষ্টা করেও আপনজন বা আত্মীয়স্বজনের লাশ দেখার সুযোগ পাইনি। 

মৃত্যু শুকরিতি হালসোনার ভারতীয় স্বজনরা জানান, আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না আবেদনের পেক্ষিতে দুই দেশের বিজিবি ও বিএসএফ সাড়া দিয়ে আমাদের এমন একটি মুর্হতের ব্যাবস্থা করে দেবে। এঘটনার পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষি বাহীনিকে স্বাধুবাদ দিচ্ছেন স্বজনরা। এমন ঘটনায় দুই দেশের নাগরিকদের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ সহ সন্মান বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা। ভারতে বসবাসকারী স্বজনরাও বিজিবি ও বিএসএফ এর এমন মানবতায় কৃতজ্ঞতা জানান। 

মেহেরপুরে মুজিবনগরে বসবাসরত ছোট বোন লাখি মন্ডল জানান, মৃত্যুর বোনের মুখটা শেষ বারের মত দেখতে পেয়ে কিছুটা মনকে শান্তনা দিয়েছি। চার বছর আগে বোনের জীবিত মুখটা দেখেছিলাম। আমি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শেষ বারের মত আমার বোনের মুখটা দেখার ব্যাবস্থা করার জন্য। 

মনঞ্জু মল্লিক জানান, ৩০ বছর আগে বোনের বিয়ের পর আর বোনের সাথে সরাসরি দেখা হয়ে ওঠেনি আমার। মোবাইল ফোনে কথা হতো। তবে মৃত্যুর পর বোনকে শেষ বারের মত দেখতে পেয়ে কিছুটা মনের দু:খ কমেছে। সকাল থেকে খুব চিন্তায় ছিলাম বোন কে দেখতে পাবো কিনা। চাতক পাখির মত চেয়ে ছিলাম তারকাটার দিকে কখন বোনের কফিনটা কাছে আসবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন উদ্যেগে খুশি তারা। আমাদের মত অন্য নাগরিকদের এমন সুযোগ করে দেওয়ারও আহবান জানান তিনি। 

মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য শ্রীবাস্তন মল্লিক বলেন, অনেক তারকাটার কাছে গিয়েও আকুতি জানিয়ে চোখের জলে ফিরে এসেছে। সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফ এর এমন মানবতায় বেশ খুশিতারা। আগামীতে এমন মানবতা মূলক কাজ করবে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বলে তিনি মনে করেন। 

চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটেলিয়ন পরিচালক শাহ মো: ইশতিয়াক, পিএসসি জানান, বিজিবি-বিএসএফ এর মানবতামূলক কার্যক্রম উভয়ই দেশের সীমান্তে বসবাসরত সীমান্তবর্তী জনগণের মধ্যে সুম্পর্ক উন্নয়ন সাধিত হবে এবং ভবিষ্যতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

এই মানবতা মূলক কার্ষক্রমে ভারতের নদীয়া জেলার জিন্দা বিএসএফ কোম্পানী কমান্ডার তরুন সরমা ও মুজিবনগর বিজিবি কোম্পানী কমান্ডার শেখ শহীদ সহ বিএসএফ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।