লন্ডনের বুকে আমি এক যাযাবর
অন্যান্য

লন্ডনের বুকে আমি এক যাযাবর

রাজীব আহমেদ, লেখক,গবেষক লন্ডন থেকে-

ইংল্যান্ডে বেড়াতে আসার পর প্রথম দিকে লন্ডনের নানান দর্শনীয় জায়গায় যাতায়াতের প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই ট্রেনে চড়েছি। লন্ডন শহরটার তলদেশ দিয়ে মাকড়সার জালের মতো রেলপথ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে (কিছুদিন আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে পোস্ট দিয়েছি)। যে কোনো রেলস্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে টুপ করে মাটির নিচে নেমে গেলেই চোখের সামনে বিশাল পাতালপুরী উন্মুক্ত হয়ে যায়। মাটির তলদেশ ও উপর মিলিয়ে বিদ্যমান রেলপথে রুট এবং ট্রেন বদলিয়ে লন্ডন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। ‌দ্রুতগামী ট্রেনে যাতায়াত করলে সময় খুব বেশি না লাগলেও ভাড়া বাবদ ওয়েস্টার কার্ডে সযত্নে ভরে রাখা পাউন্ড পানির স্রোতের মতো তরল হয়ে ভেসে যায়..!

পর্যটক হিসেবে ব্যাপারটাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে পাউন্ড খরচ হচ্ছিলো, তাতে করে অনেক হিসাব-নিকাশের পর বাংলাদেশ থেকে টাকা বদলিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসা সীমিত পাউন্ড-এর ভরসায় টানা তিন মাস লন্ডনের বুকে টিকে থাকা কঠিন বৈকি; ঠিক তখনই কথাপ্রসঙ্গে আমার এমবিএ-র সিনিয়র সহপাঠী, তুখোর হিসাববিদ, ইংল্যান্ড প্রবাসী নজরুল ইসলাম সেলিম ভাই একটা দারুণ বুদ্ধি বাৎলে দিলেন!

তখন পর্যন্ত লন্ডনের অলিগলিতে ছুটে বেড়ানো লাল বাসে একাকী ওঠার অভিজ্ঞতা হয়নি। সেলিম ভাই বললেন, ইংল্যান্ডে ট্রেন ভাড়া সবচেয়ে বেশি (কখনো কখনো সেটা বিমান ভাড়াকেও হার মানায়), তবু নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সময় বাঁচাতে মানুষজন ট্রেনে ওঠে। তিনি পরামর্শ দিলেন- নিতান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ট্রেনে চড়ার দরকার নেই। বাংলাদেশ থেকে ঘুরতে এসেছো, লাল বাসে চড়ে ঘোরাঘুরি শুরু করো, তাহলে লন্ডনের আনাচে-কানাচে অনেক বেশি কিছু দেখতে পারবা!

চিন্তা করে দেখলাম- বুদ্ধি তো মন্দ নয়? লন্ডনের বুকে আমি এক যাযাবর (ব্যস্ততাহীন পর্যটক); পকেটে পাউন্ডের সীমাবদ্ধতা থাকলেও আপাতত সময়ের কোনো অভাব বা ঘাটতি নাই; হাতে রয়েছে অফুরন্ত অবসর (ঘুরে-ফিরে সময় কাটানোটাই বরং আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার)!

লাল বাসে যাতায়াত করলে সময় বেশি লাগলেও মহামূল্যবান বিলেতি পাউন্ড সাশ্রয় করা যায়। বাসে উঠা মাত্র ১.৭৫ পাউন্ড কেটে নেয় বটে, কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় কোনো বাসে উঠে ওয়েস্টার কার্ড পান্চ করলেও নতুন করে আর কোনো পাউন্ড কর্তন করে না! এভাবে প্রতি ২৪ ঘন্টায় সর্বোচ্চ তিনবার ৫.২৫ পাউন্ড পর্যন্ত ভাড়া কেটে নিতে পারে। এরপর ওইদিনের মধ্যে যতবার খুশি বাসে চড়েন না কেন, আর কোনো পাউন্ড খরচ হবে না। সবকিছু জেনে বুঝে আমি তাই ট্রেনের বদলে যথাসম্ভব বাসে চড়া শুরু করলাম আর প্রতিদিন রাতে থাকার জায়গায় ফিরে এসে মনে মনে হিসেব কষি- ট্রেনের বদলে বাস ব্যবহার করায় যাতায়াত বাবদ আজকে মোট কত পাউন্ড সাশ্রয় হলো? সেই সংখ্যাটাকে আবার ১৫৩ দিয়ে গুণ করলে বাংলাদেশী টাকায় সাশ্রয়ের পরিমাণটা অ-নে-ক বড় মনে হয়!

প্রতিদিন যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে আগেভাগে বাসা থেকে বের হতাম। একেকদিন একেক রুটের বাসে চড়ার চেষ্টা করেছি। মাঝেমধ্যে পরিকল্পনা ছাড়াই ইচ্ছেমতো (সামনে যেটা পেয়েছি) বাসে উঠে কয়েক স্টপেজ যাওয়ার পর কারণ ছাড়াই নেমে পড়েছি, তারপর ঠিক পেছনের বাসটিতে চড়ে আরো কয়েক স্টপেজ গিয়েছি। দিনের শেষ ভাগে একইভাবে ফিরতি পথের লাল বাস ধরেছি। এভাবে বিগত আড়াই মাসে লন্ডন সিটি বাসরুটগুলোর প্রায় শ'খানেক সরেজমিনে চষে ফেলেছি। লন্ডন শহরাঞ্চলে চলাচলকারী লাল বাসের চালকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মহিলা; এমনকি একজন হিজাব পরিহিত কৃষ্ণাঙ্গী মহিলাকেও লন্ডনের ব্যস্ততম রাস্তায় দোতলা লাল বাস চালাতে দেখেছি!

লন্ডন মূল শহর ও তৎসংলগ্ন শহরতলী এলাকার মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে চাইলে মুঠোফোনের ইন্টারনেট ও নিজের লোকেশন চালু অবস্থায় গন্তব্যের পোস্ট কোড দিলেই গুগল ম্যাপ মুহূর্তের মধ্যেই সবচেয়ে সহজ পথ ও উপায় দেখিয়ে দেয়। কিন্তু কেউ যদি আমার মতো শুধু বাস ভ্রমণ করতে চান, সেক্ষেত্রে গুগল ম্যাপের অপশনে ঢুকে বাস ব্যতীত অন্যান্য অপশনগুলো ডিএক্টিভেট করে রাখতে হবে। তাহলেই বাকি দায়িত্ব গুগল ম্যাপ বেশ নিখুঁতভাবে পালন করবে- অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের best route দেখিয়ে দেবে!

লাল বাসে উঠতে হয় সামনের দরজা দিয়ে। ‌ ড্রাইভার-এর পাশে রাখা ইলেকট্রনিক ডিভাইসটিতে ক্রেডিট কার্ড, ওয়েস্টার কার্ড অথবা ডিজিটাল পাউন্ড ভর্তি মুঠোফোন ছোঁয়ালেই সবুজ বাতি জ্বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেডিট ট্রান্সফার হয়ে যায়। তারপর যেখানে ইচ্ছা- বাসের নিচতলা অথবা দোতালায় বসা যায়। নির্ধারিত টপেজ এলে হাতলের সঙ্গে থাকা stop লেখা লাল বাটনে চাপ দিয়ে থামার সংকেত দিতে হয়। ড্রাইভার তখন নামার জন্য বাসের পেছনের দরজা খুলে দেন। এক-একটি দোতালা বাসে প্রায় ১০০ জন একত্রে যাতায়াত করতে পারেন। তবে অফিসের ব্যস্ত সময়টুকু ছাড়া অন্যান্য সময় বাসের সব আসন সাধারণত পূর্ণ হয় না। দরজার নিকটবর্তী আসনগুলো বয়োবৃদ্ধ, গর্ভবতী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অসুস্থদের জন্য নির্ধারিত। তবে সে রকম কোনো যাত্রী না থাকলে যে কেউ সেথায় বসতে পারেন।

পর্যটক হিসেবে লন্ডন শহরকে পরখ করতে চাইলে প্রথমত হাঁটার কোনো বিকল্প নাই। যত হাঁটবেন- ঘুরে ঘুরে দেখবেন, লন্ডন শহরকে তত ভালোভাবে চিনতে ও বুঝতে পারবেন।‌ তবে হাঁটার উত্তম বিকল্প হতে পারে বাইসাইকেল চালিয়ে ঘোরা; সেটাও সম্ভব না হলে লাল বাসে চড়েই অনেক অলিগলিতে পৌঁছিয়ে যেতে পারবেন। বাসগুলো যেমন ধীরে চলে, তেমনি একটু পরপরই থামে (অধিকাংশ স্টপেজ বলতে গেলে ঢিল ছোঁড়ার দূরত্বে অবস্থিত); সেই সঙ্গে নির্ধারিত রুটের এমনসব সরু রাস্তায় ঢুকে যায় যে, কখনো কখনো মনে হতে পারে বাস-ড্রাইভার বুঝি বাড়ি বাড়ি থেকে যাত্রী তুলে নিতে চাচ্ছেন! লাল বাসে চড়ে দুরন্ত পাতাল রেলের মতো ফুরুৎ করে লন্ডনের সর্বত্র পৌঁছানো যায় না বটে, কিন্তু শহরের অলিতে-গলিতে অনায়াসে পৌঁছানো কিংবা লন্ডন শহরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘুরে দেখার জন্য লাল বাসের জুড়ি মেলা ভার।

অনেক পর্যটক লন্ডন শহরটা এক চক্কর ঘুরে দেখার জন্য অনেক পাউন্ড খরচ করে Hop On Hop Off বাসে ওঠেন। কিন্তু মাত্র ১.৭৫ পাউন্ড দিয়ে ৮ নম্বর লাল বাসে চড়ে বসলে টুরিস্ট বাসের গতিপথের প্রায় পুরোটাই ঘোরা হয়ে যায় (সেখানে কেবল কোনো গাইড বা ধারাভাষ্যকার থাকেন না; পার্থক্য বলতে এইটুকুই)।

আমি সবচেয়ে বেশি চড়েছি ৪০৫ নম্বর লাল বাসে। কেননা ইংল্যান্ডে আমার আবাসস্থল (লন্ডন সংলগ্ন রেডহিল এলাকা) থেকে এই একটিমাত্র লাল বাসই মূল শহরকেন্দ্রের দিকে যায়। বাসা থেকে বের হয়ে কিছুদূর হেঁটে প্রথমে ৪০৫ নম্বর লাল বাস ধরতাম, তারপর গন্তব্য অনুযায়ী অন্য কোনো রুটের বাস খুঁজে নিতাম। একইভাবে ফেরার পথে শেষমেষ ৪০৫ নম্বর বাসই ধরতে হতো। বেশ কয়েকবার গভীর রাতে ফেরার পথে বাসের যাত্রী বলতে আমি একলা, তবু ৪০৫ লাল বাস আমাকে নির্ধারিত গন্তব্য অবধি নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পর ৪০৫ নম্বর রুটের লাল বাসকে তাই বড্ড মিস করবো!