মেহেরাব হোসেন:
কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ-গাছালিসহ বাগান, গড়ে উঠছে বড় বড় দালানকোঠা, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ
মেহেরপুর শহরে একের পর এক পুকুর ভরাটের ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়ছে। জেলায় জলাভ‚মি সংরক্ষণের আশানুরূপ কোনো উদ্যোগ নেই। অনেক সময় প্রশাসনের সামনেই অবাধে পুকুরসহ জলাভ‚মি ভরাট করা হচ্ছে। গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি-কলকারখানাসহ নানা অবকাঠামো। মূলত আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রয়োগের অভাবেই অনেক ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও জলাভূমিও দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে পানির স্তরও কমে যাচ্ছে। ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। পাশাপাশি বড় বড় বৃক্ষগুলোও অবাধে নিধন করা হচ্ছে কেটে ফেলা হচ্ছে আগান-বাগানও। যার প্রভাব পড়বে আগামীর প্রজন্মের উপর বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, মেহেরপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মল্লিক পুকুর। শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে ছিল বহুদিন। স্থানীয় লোকজনদের গোসল কাপড় ধোয়া বাচ্চাদের সাঁতার শেখাসহ দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই হতো ওই পুকুরে। কিন্তু গত দুই বছরে ওই পুকুরটাও বিলুপ্তের পথে। প্লট আকারে বিক্রি করে অনেকের মালিকানাধীন কুকুরটিতে আজ দালান কোঠা তৈরি হবার পথে। অথচ মল্লিক পরিবারের ঐতিহ্যবাহী পুকুর হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিল ওই পুকুরটির। পুকুরটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল মল্লিকপাড়া যা শহরের অত্যন্ত পরিচিত পাড়া হিসেবে পরিচিত।
মেহেরপুর শহরের মল্লিকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম জানান, জন্মের পর থেকেই দেখছি মল্লিক পুকুরটি। এলাকার অনেকেই এই পুকুরে গোসল কাপড় কাঁচা সহ অনেক কাজ করতো। ছোটবেলায় গোসল করার মধ্য দিয়ে সাঁতার শিখেছি। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকায় পরবর্তীতে শরিকদের মধ্যে ভাগবাটি হওয়র ফলে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। পুকুরের অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। যেটুকু খালি আছে তাও ভরাট হওয়ার পথেই। তিনি বলেন, পাঁচ বছর পর এখানে যে একটি পুকুর ছিল এটা হয়তো জানতেই পারবে না।
জেলার প্রবীণ নাগরিকরা জানান, আজ থেকে ১৫ বছর আগেও মেহেরপুর শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লা ও এলাকাতে অর্ধশতাধিক পুকুর ছিলো। সেই সকল পুকুরে মানুষের গোসল করাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করতো। ছোট ছোট বাচ্চাদের সাঁতার শেখা গরমের দিনে একটু স্বস্তির আশায় পুকুরে ডুব দেওয়া ছিল মানুষের নিয়মিত কাজ। কিন্তু কালের বিবর্তনে শহর থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে পুকুরসহ সমস্ত জলাশয়। যার ফলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছে। ঠিক তেমনি অগ্নিকান্ডসহ শহর বড় কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়লে মানুষের জান মালেরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের বাসিন্দা লিটন হোসেন জানান, স্কুল জীবনে আমরা যখন পড়ালেখা করতাম তখন প্রতিদিনই গ্রাম থেকে মেহেরপুর হাইস্কুলে আসতাম। তিনি বলেন, রাস্তায় একটু হাঁপিয়ে গেলে বা ঘেমে গেলে দাঁড়িয়ে যেতাম কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পরে আবারো রওনা দিতাম। কিন্তু বর্তমানে সড়ক জুড়ে হাহাকার বড় কোন গাছ নেই, দাঁড়ানোর মত কোন ছায়া নাই। এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশের উপর চরম প্রভাব পড়বে। তাই তিনি এখান থেকে বের হয়ে আসতে এবং বেশি করে গাছ লাগাতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি।
জানতে চাইলে মেহেরপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে গ্রাম শহর হচ্ছে, শহর আরো উন্নত হচ্ছে। কিন্তু উন্নতির এই যাতাকলে পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর বাওর পুকুর সহ বিভিন্ন জলাশয়। যার ফলে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। তিনি বলেন, এখান থেকে বের হতে না পারলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যা থেকেই যাচ্ছে। তিনি বলেন, আজ থেকে দুই তিন বছর আগেও মেহেরপুরে তাপমাত্রার কোন প্রভাব ছিল না। অথচ গত দুই বছর ধরে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার কবলে পড়তে হচ্ছে মেহেরপুরকে। তাই তিনি এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে পুকুর ভরাট ও গাছপালা নিধন আইন কার্যকর করার আহবান জানান সংশ্লিষ্টদের।
মেহেরপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক সাইফুজ্জামান জানান, মেহেরপুর শহরে চরম আকারে পুকুর সংকট রয়েছে। শহরে বড় কোন জলাশয় বা পুকুর নাই। যার জন্য অগ্নিকান্ড বা বড় কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়লে চরম সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। তিনি বলেন, রিজার্ভ ট্যাংকিতে যে পরিমান পানি থাকে অনেক সময় তা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। তাই অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের জান ও মালের অনেকটাই ক্ষতি হয়ে যায়। তিনিও মেহেরপুর শহরে বেশি বেশি পুকুর নির্মাণের দাবি জানান।
এবিষয়ে মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র মাহাফুজুর রহমান রিটন জানান, পুকুর ভরাট করতে বা খনন করতে হলে পৌরসভার অনুমতির প্রয়োজন হয়। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে আসলে অনেক সময় অনুমতি দিতে হয়। তিনি পুকুর ভরাট বা বৃক্ষ নিধনের ক্ষেত্রে যে আইন রয়েছে তা আরো কার্যকর করার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আজিজুল ইসলাম বলেন, জেলায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর, দিঘী জলাশয় ভরাট করা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যে সকল সরকারি নদ-নদী ও খাল বিল রয়েছে তাপ পূণ্য খননের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। সে লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে ইতিমধ্যে ভৈরব নদীসহ বেশ কয়েকটা খাল অন্য খনন করা হয়েছে ভবিষ্যতে আরো করা হবে। তিনি বলেন পরিবেশ রক্ষায় সরকার যে কোন পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত রয়েছে।







