ডি.এম.মকিদ:
”পূর্ণ নহে মন যার ইতিহাস জ্ঞানেজীবন তিক্ত হ’তে মিষ্ট নাহি জানে;অতীত কাহিনী মালা গাঁথে যে যতনেনব নব জন্ম সেই লভে এ জীবনে।”----আরব কবি
ইতিহাস মানব জাতির বহুমুখি অভিজ্ঞতার দলিল। শিল্প সাহিত্য অর্থনীতি নৃকূলতত্ত দর্শন ভূগোল ভূতত্ত¡ ভাষাতত্ত সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় হইতে ইতিহাস উপকরণ সংগ্রহ করে। এককথায় ইতিহাসের বিষয়বস্তু মানুষ।
আধুনিক যুগে বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে ইতিহাস লেখার চেষ্টা চলছে। শাসক সমাজ রাজনীতি ধর্মনীতি ও প্রত্বতাত্বিক বিষয়সমূহ ইতিহাসের প্রাচীন উপকরণের অন্তর্ভুক্ত। মানবজাতির জীবন সংগ্রাম, সুখদুঃখ, হাসিকান্না এবং সামাজিক বিবর্তন ইতিহাসের প্রধান বিষয়বস্তু। সামগ্রিকভাবে বাচবিচার না করে মানব সমাজের যে সঠিক কাহিনী রচিত হয় তাহাই প্রকৃত ইতিহাস।
দেশের গবেষণারত বিদ্বৎসমাজকে মাতৃভূমির পবিত্র মাটি, জলবায়ূ, নদনদী পাহাড়পর্বত বনজঙ্গল ও পারিপার্শিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে নিচের তলার মানুষের সুখ দুঃখের কথাও জানতে হবে। যে দেশের মাটির রসে এ দেহ লালিত, যার রঙ ও রূপ বৈচিত্রে হৃদয়মন বিকশিত তার ইতিহাস আমার অজ্ঞাত থাকবে এর চেয়ে মারত্মক অপরাধ আর থাকতে পারে না।”
সাহিত্য ও ইতিহাসকে প্রকৃত গণমুখি ভাবধারায় চালিত করতে হবে। আমরা যাহা লিখি, তা পাঠকসমাজে সহজবোধ্য কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে। আমরা গৃহকোণের সন্ধান না জেনে বহির্জগতের সন্ধানে ঘুরে মরি। ঘরের দ্বীপ জ্বালালে সেই আলোকবর্তিকা বাইরের পথও চিনিয়ে দেবে। সেজন্য ঐতিহাসিকের পক্ষে স্বদেশ ও জাতির ইতিহাস জানা একান্ত কাম্য।
ইতিহাস নিজ প্রয়োজনে সঠিক ছবি আঁকবে। ইতিহাসবিদ বিচারকের সাথে তুলনীয়। বিচারক বিচার করেন মানুষের অধিকার অপরাধের, ঐতিহাসিক বিচার করেন ব্যাষ্টি, দেশকাল ও জাতির, নির্ভূল তথ্য সংগ্রহ ও উহার সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
ঐতিহাসিকের নিকট ব্যক্তিগত রুচি বড় কথা নহে। সঠিক তথ্যের সন্ধান করা তাঁর পবিত্র দায়িত্ব। সত্য প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিকের হাতে থাকবে ন্যায়ের মশাল এবং দুর্জয় সাহস। ন্যায় ও সত্যের খাতিরে তাঁকে নির্দ্বিধায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কীর্তিমান গবেষকদের বিরোধিতা করতে হবে। সেজন্য চাই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও মনোবল। ইতিহাস মানব জীবনের জীবন্ত আলেখ্য। জীবন ও ইতিহাস তাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
ঐতিহাসিক থুর্কিদিসিস যুক্তির মাধ্যমে ইতিহাস প্রণয়নের যে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির নজির সৃষ্টি করেছেন আমরা যেনো সেই উচ্চমান হতে সরে না পড়ি। ঐতিহাসিকের পক্ষে সাম্প্রদায়িক মনেবৃত্তি ও উগ্র দেশত্ববোধ সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। দেশপ্রেম ভালোকথা রাষ্ট্ররক্ষার প্রয়োজনে। কিন্তু ঐতিহাসিক বৈচিত্রময় ঘটনাবলির নিঁখুত ছবি অঙ্কনে সর্বদা যত্নবান থাকবেন। যিনি যতটুকু ন্যায় ও সত্যের মর্যদা রক্ষা করেন তিনি ততবড় ঐতিহাসিক। ফলকথা ইতিহাসের মাপকাঠি সত্য কথন ও সত্য নিরূপণ।
প্রাচীন ঐতিহ্য, কিংবদন্তি ও গল্পগাথাকে নিরাসক্ত দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে বিশ্লেষণ করত বুদ্ধিগ্রাহ্য, উপাদান সংগ্রহ করতে হবে। অতীতের মৃতকঙ্কালের স্মৃতিরেখার সহিত বিজড়িত আছে প্রাণবন্ত বর্তমান। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অতীতের সাথে বর্তমানের সংযোগ এবং ভবিষ্যতের প্রতি বাহু সম্প্রসারণ। অতীতের উপলব্ধি এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত উদ্ভাসন।
আধুনিক যুগের ন্যায় পুরাকালেও দেশ সমস্যাবহুল ছিলো। কিভাবে সে যুগের মানুষ ঐসব সমস্যার সমাধান করতো তা জানার আকাক্সক্ষা মানবমনে জাগরিত হওয়া স্বাভাবিক। দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি বিধানের জন্য ইতিহাসের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। শাসক সমাজ ’দেওয়ালের লিখন’ হতে শিক্ষাগ্রহণ করে থাকেন।
স্বদেশ ও স্বজাতির ইতিহাস চর্চা করা সামাজিক আত্মচেতনার লক্ষণ। যে জাতির ইতিহাস নাই, সেই জাতি নিঃস্ব ও হতভাগা আর যে জাতির ইতিহাস আছে অথচ খোঁজ রাখে না সে জাতিও তদ্রুপ। আমরা শেষাক্ত জাতির সহিত তুলনীয়।
মানব জ্ঞানের তিনটি প্রধান শাখা-বিজ্ঞান,দর্শন ও সাহিত্য। ইতিহাস ইহার কোনটি? কোনো কোনো পদ্ধতি মত প্রকাশ করেছেন, ইতিহাস বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত নহে। যুক্তিতর্ক, পরীক্ষনিরীক্ষার মাধ্যমে যে তথ্য উদঘাটিত হয় তাহাই ইতিহাস। সেজন্য যুক্তি প্রমাণ নির্ভর জিজ্ঞাসা যদি বিজ্ঞান হয়, তবে ইতিহাসও বিজ্ঞান। জিজ্ঞাস্য বিষয়ের সাক্ষ্য প্রমাণকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে তথ্যের প্রতিষ্ঠা ও ব্যাখ্যা করা ইতিহাসেরও কাজ। সুপÐিত জে.বি.বিউরী বলেছেন ”ইতিহাস বিজ্ঞান বই আর কিছুই নহে।”
ইতিহাসের স্রোতধারায় যে তরঙ্গময় অভিঘাতের সৃষ্টি হয় তা মানবমনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিত্য নতুন পরিবেশ সৃষ্টি এ বিশ্বের লীলাখেলা।
প্রাচীনকালে কেমন ছিলো, বর্তমান রূপই বা কী? সৃষ্টির এই বৈচিত্রময় ক্রমবিকাশ ও অজানাকে জানার নেশা মানবমনে চিরন্তন। সেই নেশা হতেই মানুষ তার চিহ্ন মানস প্রতিফলন রেখে যেতে চায়। যুগে যুগে মানব সমাজের পরতে পরতে ইতিহাসের পাতায় পাতায় সে প্রতিফলনের চিহ্ন অঙ্কিত আছে। যে জাতির ইতিহাস যতো সমৃদ্ধ সে জাতির গৌরব ততোধিক। প্রত্যেক জাতির সাহিত্য ও সংস্কৃতি সজীব হইয়া ফুলে ফলে সুশোভিত হয় ইতিহাসের পটভুমিকায়।

