আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এক বছর পূর্ণ হওয়ার সময়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি শহরে সবার চোখ শহরের নাম- বাখমুত। ইউক্রেনের পূর্ব ডনেস্ক অঞ্চলের এই ছোট্ট শহরটি এখন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষেত্র। গ্রীষ্মে পূর্বাঞ্চলীয় শহর সেভেরোডোনেটস্ক এবং লাইসিচানস্ক দখল নেওয়ার পর, এই বাখমুতে হতে যাচ্ছে রুশ ফেডারেশনের আরেকটি বড় বিজয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ফ্রন্টলাইনের পরিস্থিতিটিকে ‘খুব কঠিন’ বলে বর্ণনা করেছেন। বলা হচ্ছে, বাখমুতে মাসব্যাপী চলা যুদ্ধে প্রতিদিন শত শত ইউক্রেনীয় এবং রাশিয়ান হতাহত হচ্ছেন। ইউক্রেনীয় আইন প্রণেতা এবং ন্যাটো সংসদীয় সমাবেশে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান ইহোর চেরনিভ বলেন, “যদিও কিয়েভের কাছে বাখমুত ‘কৌশলগত গুরুত্বের’ নয়, তবুও তারা যতদিন সম্ভব এটি আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করবে।”
বাখমুতের ইতিহাস
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের আগে ছোট্ট এই শহরটি লবণ খনির শিল্পের জন্য পরিচিত ছিল। ৭০ হাজার বাসিন্দার ছিমছাম শহরটি নাম বাখমুতোভকা নদী থেকে নেওয়া হয়েছে।
এখনকার শহরটি যেনও আগের সেই বাখমুতের খোলস। ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম ইউক্রেনস্কা প্রাভদার তথ্য অনুসার, বাখমুতের ৯০ শতাংশ মানুষ পালিয়েছেন। বাখমুতের ডেপুটি মেয়র জানিয়েছেন, শহরের শেষ চার হাজার বেসামরিক নাগরিক গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানি বিহীন অবস্থায় আশ্রয়কেন্দ্রে লুকিয়ে রয়েছেন।
কয়েক হাজার বাসিন্দা রয়েছেন যারা প্রতিদিন গোলাগুলি প্রত্যক্ষ করছেন। বাখমুতের প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সেনাদের পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিখা যুদ্ধের কথা। বিদ্যুৎহীন বাখমুত পরিণত হয়েছে ভূতুড়ে শহরে।
বাখমুত কেন গুরুত্বপূর্ণ
পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের ডনেস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের জন্য রসদপত্র সরবরাহের একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পথের ওপর বাখমুত ও সোলেডার শহরের অবস্থান। এর নিয়ন্ত্রণ দখল করতে পারলে রাশিয়া জায়গাটিকে ক্রামাটরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কের মত দুটি বড় শহরের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য একটা ভিত্তি তৈরি করতে পারবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার-এর রাশিয়ার বিশ্লেষক ক্যারোলিনা হার্ড বলেন, ‘ছোট শহরটি এমন কয়েকটি জায়গার প্রতিনিধিত্ব করে, যা রাশিয়ার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, যে কোনো মূল্যে শহরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে ইউক্রেনীয়রা।’
বাখমুতের পতন হলে কি হবে?
বাখমুতের পতন রাশিয়ার জন্য কৌশলগত বিজয় হবে। তবে এর জন্য অনেক প্রাণ ঝরেছে। পশ্চিমারা দাবি করছে, এ পর্যন্ত যুদ্ধে নিহত বা আহত হওয়া রাশিয়ার সেনার সংখ্যা ২ লাখের বেশি; আগস্টে যা ছিল ৮০ হাজার ছিল। চেরনিভ বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ানরা বাখমুতকে নেওয়ার জন্য প্রচুর সম্পদ এবং মজুদ খরচ করতে বাধ্য হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা সফল হয়েছে।’
মাইকেল কফম্যান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের রাশিয়া স্টাডিজের পরিচালক। তিনিও হার্ডের সঙ্গে একমত যে, বাখমুত ছাড়তে ইউক্রেনীয়দের খুব কষ্ট হবে সত্যি, তবে এখানে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। কফম্যান বলেন, ‘যদি রুশ বাহিনী স্লোভিয়ানস্ক এবং ক্রামতোর্স্কের দিকে অগ্রসর হয়, তবে সুরক্ষিত ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামনে পড়বে।’
হার্ড বলেন, ‘লুহানস্ক ওব্লাস্টের দখলকৃত পোপাসনা থেকে বাখমুতে আসতে রুশ বাহিনীর অনেক সময় লেগেছিল। অথচ দূরত্ব ছিল কেবল ২০ মাইল। মোট কথা, মিরাকল না ঘটলে বাখমুতের পতন সময়ের ব্যাপার। রাশিয়া চাইবে যত কম ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে শহরটির দখল নেওয়া; যেখানে ইউক্রেনীয়রা চাইবে এখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সামনের যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা।







