১১১ ধরণের পিঠাপুলির উৎসব হয়ে গেল মেহেরপুর গাংনী মহিলা কলেজে
টপ নিউজ মেহেরপুর

১১১ ধরণের পিঠাপুলির উৎসব হয়ে গেল মেহেরপুর গাংনী মহিলা কলেজে

সবার সংবাদ ডেস্ক:

বাংলার নারী সমাজ অতীতে শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর ছিল সত্য, কিন্তু স্বীকার করতে হবে এদেশের নারী সমাজ লোকজ শিল্পকর্মে অত্যন্ত নিপুণ এবং সুদক্ষ। এলাকা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন বা আলাদা রকম পিঠা তৈরি হয়ে থাকে।  গ্রামাঞ্চলে সাধারণত নতুন ধান ওঠার পর থেকেই পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়। শীত এলে বাহারি পিঠার উপস্থাপন ও আধিক্য চোখে পড়ে।

বাঙালির লোক ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পিঠা-পুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বহুকাল ধরে। এটি লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহি:প্রকাশ। যান্ত্রিক সভ্যতার এই ইট-কাঠের প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে পিঠার ঐতিহ্য। সময়ের স্রোত গড়িয়ে লোকজ এই শিল্প আবহমান বাংলার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠলেও এই যুগে সামাজিকতার ক্ষেত্রে পিঠার প্রচলন অনেকটাই কমে এসেছে।

তারপরও প্রতিবছরের মত এবারও বিপুল লোক সমাগমের মধ্য দিয়ে বুধবার মেহেরপুরের গাংনী মহিলা কলেজে অনুষ্টিত হয়ে গেল দিনব্যাপী জমজমাট পিঠা মেলা। প্রাণের টানে বাঙালী সাজে ছুটে আসা মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠেছে মেলা স্থল। শীতের পিঠা-পুলিসহ নানা অঞ্চলের বৈচিত্রময় পিঠার পসরা সাজিয়ে উৎসবে আগত মেয়েরা বাড়ি থেকে হরেক ধরণের বিলুপ্তপ্রায় পিঠা বানিয়ে স্ব-স্ব ষ্টলে পসরা সাজিয়ে বসেছিল। যা দর্শনার্থীদের মনোযোগ কেড়েছে। শুধু খাবার হিসেবেই নয় বরং লোকজ ঐতিহ্য এবং নারী সমাজের শিল্প নৈপুণ্যের স্মারক রূপেও পিঠা বিবেচিত হয়। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে পিঠা।

প্রতি শীতেই গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা পুলির উৎসব। গ্রামীণ ঐতিহ্য ও নতুন প্রজন্মের কাছে হরেক রকমের পিঠার পরিচয় তুলে ধরতে মেহেরপুরের গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজে অনুষ্ঠিত হলো পিঠা উৎসব। বুধবার দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত এ উৎসবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ২৩টি স্টল সাজিয়েছিলেন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী শত রকমের বাহারী ও মুখরোচক পিঠা। ভোজন রসিকরাও এসে পিঠা খেয়ে নানা প্রশংসা করছেন। আর আয়োজকরা বলছেন প্রতি বছরই এমন আয়োজন থাকবে নতুন প্রজন্মের কাছে পিঠা পুলির পরিচিতির জন্য। গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজ চত্ত্বরে শুরু হওয়া এ পিঠা উৎসবে ছিল বেশ ভিন্নতা। গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্য নাম ছিল স্টলগুলোর। শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে তৈরী করা এসব পিঠা সাজিয়েছেন তাদের স্টলে।

সেখানে শোভাবর্ধন করে সাজানো ছিল- মালাই পিঠা, মুঠি পিঠা, কলা পিঠা, খেজুর পিঠা, ক্ষীর কুলি, গোকুল পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, পুলি পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা, পাকান পিঠা, নারকেলের সেদ্ধ পুলি, তেলের পিঠা, চাঁদ পাকান পিঠা, ঝুরি পিঠা, ছাঁচ পিঠা, দুধ চিতই, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা, ঝাল পিঠা, মালপোয়া, নকশি পিঠা সহ ১১১ ধরণের পিঠা। ভোজন রসিকরা বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছেন আর স্বাদ নিচ্ছেন। সেই সাথে অনেকে এসেছেন তাদের সন্তানদেরকে পিঠা পুলির স্বাদের পাশাপাশি পিঠার সাথে পরিচয় ঘটাতে।

কাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোকাইয়া খাতুন ও সুমাইয়া খাতুন জানান, পিঠা উৎসবের লক্ষ্য হলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পিঠা পুলির সাথে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয়ার একটা মাধ্যম। এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মরা যেমন হরেক রকম পিঠার সাথে পরিচিত হতে পারছে তেমনি স্বাদ নিতেও ভুলছেন না। এমনি আয়োজন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করা উচিৎ। একই কথা জানিয়েছেন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথীয়া ও শাহানাজ ইসলাম।

পিঠা উৎসব উপভোগ করতে আসা স্কুল শিক্ষিকা জাকিয়া সুলতানা জানান- বিদেশী অনেক খাবার আমাদের দেশে জায়গা করে নিয়েছে। যার ফলে মায়েদের হাতের অনেক পিঠা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রতিবছর পিঠা উসবের আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্ম দেশি পিঠায় পরিচিত হতে পারবে।

কলেজ শিক্ষিকা নিলুফার চৌধুরী জানান- গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে শীতকালে নানা ধরণের পিঠাপুলি তৈরী হয় প্রতিটি বাড়িতে। বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পিঠা-পুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বহুকাল ধরে। পিঠা উৎসবের আয়োজন এটি লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।

পিঠা উৎসবে আসা অতিথি গাংনী থানার অফিসার ইনচার্জ অব্দুর রাজ্জাক জানান- অনেক পিঠার সাথেই আমাদের পরিচয় হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক পিঠার নাম জানা থাকলেও স্বাদ মনে নেই। আজকের এই পিঠা উৎসবে অনেক পিঠা খেয়ে ছোট বেলার অনেক স্মৃতিই মন করিয়ে দেয়। এভাবে শীতভর পিঠা উৎসব হোক গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে।

গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারি অধ্যাপক বাংলা বিভাগ রমজান আলী জানান- ছোটবেলায় মায়েদের হাতের পিঠা পুলির স্বাদে সময় কাটতো। শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পিঠাপুলি তৈরী করা হতো। জামাই আদর ও আত্মীয়তা করা হতো মুখরোচক ও বাহারী পিঠা দিয়ে। এমন পিঠা উৎসব প্রতিবছরই করা হবে।

কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খোরশেদ আলম জানান, শীতের শেষের দিকে হলেও আমরা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহি পিঠা নিয়ে পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এ উৎসবে বিলুপ্তি হওয়া সহ নতুন নতুন পিঠা নিয়ে স্টল সাজানো হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ পিঠা খেতে এসেছেন। আমাদের এই উৎসবে যারা এসেছেন তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রতিবছরই এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন হবে। এছাড়াও উৎসবে পিঠা নিয়ে অংশ গ্রহণকারিদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। ১২ মাসে ১৩ পার্বনের দেশ বাংলাদেশ। বাঙালী মানেই ভোজন। খাদ্যরসিক বাঙালি প্রাচীনকাল থেকেই প্রধান খাদ্যের পরিপূরক মুখরোচক অনেক খাবার তৈরি করে আসছে। এভাবেই খাদ্যে হাজার বছরের সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী আমরা। তাই শীত এলে পিঠা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাঙালির কাছে। পিঠা শুধু খাবার হিসেবেই নয় বরং লোকজ ঐতিহ্য এবং নারী সমাজের শিল্প নৈপুণ্যের স্মারক রূপেও বিবেচিত হয়।

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে পিঠা। যখনই পিঠা-পায়েস, পুলি কিংবা নাড়ুর কথা উঠে আসে, তখনি যেন শীত ঋতুটির আগমনি বার্তা মনের দরজায় উঁকি দেয়। এ কারণে প্রতি শীতেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা পুলির উৎসব। আর পিঠাপুলির এই আনন্দ নিতে মানুষ শীত এলেই ছুটে যায় শহর ছেড়ে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে। পিঠা মানেই শীতকাল। তাই বিভিন্ন গ্রামের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পিঠা উৎসব মেলা শুরু হয়েছে। নিজ নিজ বাড়ি থেকে পিঠা তৈরী করে এনে মেলায় অংশ নেয় সকলে। তাই এই আয়োজন হয় সার্বজনীন। এবার মেহেরপুর সরকারী কলেজেও শুরু হবে প্রতিবারের মত এবারের পিঠা উৎসব।