আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দিল্লির রাস্তায় পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে জ্বালাময়ী স্লোগান দিচ্ছেন এক তরুণী। কখনো পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তির মধ্যে, কখনো মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শাসক গোষ্ঠীর সমালোচনা করছেন। আবার কখনো টানা অনশনে বসে চলে আসছেন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দৃশ্যের কারণে গত কয়েক মাসে ভারতের ছাত্র-যুব আন্দোলনে বারবার সামনে এসেছে নেহা বোরার নাম। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণী জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। পাশাপাশি তিনি নকশালপন্থী দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি।
তবে শুধু সাংগঠনিক পরিচয়ে নেহা বোরাকে পুরোপুরি চেনা যায় না। গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনায় তাকে প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখা গেছে। শিক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা সংশোধন—বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে সরব হয়েছেন তিনি। কে এই নেহা বোরা? অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে ভারতের আন্দোলনের দৃশ্যপটে এতটা দৃশ্যমান হয়ে উঠলেন তিনি?
প্রতিবাদী এক মুখ
হিন্দুস্থান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পান নেহা বোরা। ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনে এআইএসএসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন অংশ নেয়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সেখানে শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক এবং সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেন নেহা।
টানা ২৩ দিন খোলা আকাশের নিচে অনশন করেন তিনি। একপর্যায়ে তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। চিকিৎসকেরা অনশন ভেঙে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যান নেহা। তার এই অবস্থান জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কাড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে তার বিভিন্ন জ্বালাময়ী বক্তৃতার ভিডিও। তবে নেহা কখনো এই আন্দোলনকে নিজের বা কোনো একক সংগঠনের কৃতিত্ব হিসেবে দেখেননি। তার মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভারতের তরুণদের ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি; এটি বহু বছরের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার ফল।
জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে
যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মধ্যেই নেহার রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা আরও বেড়ে যায়, যখন তিনি ভারতের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে একই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই সিজেপির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর পাশে বসেছিলেন নেহা।
এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন রাহুল। বৈঠক শেষে নেহা সাংবাদিকদের জানান, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার গলদ নিয়ে তাদের আলোচনা হয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে তারা একচুলও সরবেন না। রাহুল গান্ধীও প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। ভারতের মূলধারার রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় এক নেতার সঙ্গে একই মঞ্চে নেহার উপস্থিতি তার পরিচিতিকে ছাত্রনেতার গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়।
রাঁচিতে কালি, থামেননি নেহা
দিল্লির বাইরে অন্যান্য রাজ্যেও নেহার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) ও জেএসএসসির পরীক্ষা এবং নিয়োগে দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি রাঁচিতে যান। সেখানে একটি বিক্ষোভ চলাকালে এক ব্যক্তি নেহার গায়ে কালি ছুড়ে মারেন। ঘটনাটি নিয়ে গোটা ভারতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে এতে দমে যাননি নেহা।
কালিমাখা শরীর নিয়েই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন, "মুখে কালি ছুড়ে মারলে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনে আমি প্যালেট গান এবং পুলিশের লাঠিপেটার মুখোমুখি হয়েছি। তারা কি মনে করেন, সামান্য কালি ছুড়ে মেরে সারা দেশের ছাত্র-যুবদের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা যাবে?"এরপর বিহারেও সিজেপির বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে সরব হন তিনি।
এবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও
সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন নেহা। ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলো সরব হলে এই আন্দোলন শুরু হয়।
দিল্লির বিক্ষোভে সিজেপি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। নির্বাচন কমিশনের দাবি ছিল, মৃত ও অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। এই আন্দোলনের মধ্যে ২ অক্টোবর নেহা বোরা, যোগেন্দ্র যাদবসহ কয়েকশ বিক্ষোভকারীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।
৪ অক্টোবর ব্যারিকেড ভেঙে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় নেহাকে আবারও আটক করা হয়। পরে তাকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে সন্ধ্যায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতেও থামেননি তিনি। ৬ অক্টোবর কলকাতায় একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নেহা ঘোষণা দেন, “দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে।”
থিয়েটার থেকেই রাজনীতিতে
নেহার রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরুটা প্রথাগত ছাত্ররাজনীতি দিয়ে হয়নি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ‘সাংওয়ারি’ নামে একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এই দলের হয়ে নিয়মিত পথনাটকসহ বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নিতেন তিনি। এসব পথনাটক তাকে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের সমস্যা এবং রাজনীতির বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। থিয়েটারের অভিজ্ঞতায় তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার পরিধি বাড়তে থাকে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর সরাসরি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। শিক্ষা খাতে বেসরকারিকরণ, ফি বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও নারীদের নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে ক্যাম্পাসের আন্দোলনে সক্রিয় হন নেহা। সাংগঠনিক দক্ষতা ও আন্দোলনে সক্রিয়তার কারণে একপর্যায়ে তিনি এআইএসএর জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান।
পরিবার বিজেপি সমর্থক, নেহা বেছে নেন বামপন্থা
নেহা বোরার জন্ম ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের পাহাড়ি জনপদ খাটিমায়। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। বাবার বদলির চাকরির কারণে শৈশবের একটি বড় সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কেটেছে তার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির দিল্লি পাবলিক স্কুলেও পড়াশোনা করেছেন নেহা। উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে পাড়ি জমান তিনি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ড. বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাসথেটিকসে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিষয়ে পিএইচডি করছেন তিনি।
নেহার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও আলোচনায় এনেছে তার পারিবারিক পরিচয়। তিনি এমন একটি পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, যাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ তার বর্তমান অবস্থানের বিপরীত। নেহার পরিবার দীর্ঘদিনের কট্টর বিজেপি সমর্থক। দিল্লিতে আসার পর বামপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে শুরু করলে পরিবারের সঙ্গে তার আদর্শিক মতপার্থক্য তৈরি হয়। ফ্রন্টলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা নিজেই বলেছেন, এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে অনেক সময় তাদের বাড়ির পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠত। তবে স্নাতক পড়ার সময় থেকেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মতো মানসিক ও আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন তিনি। আর সেই স্বাধীনতাই তাকে নিজের রাজনৈতিক পথ বেছে নিতে সাহায্য করে।
গডসে বনাম ভগৎ সিং: আদর্শের লড়াই
নেহার আন্দোলন শুধু কিছু দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এটিকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর লড়াই হিসেবে দেখছেন। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস ও বিজেপির রাজনীতির কঠোর সমালোচক তিনি।নেহার মতে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিভাজনের রাজনীতি দেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী বিষয়গুলোও গুরুত্ব হারাচ্ছে।
তার ভাষ্য, এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই হিন্দু-মুসলমান বা ধর্মীয় মেরুকরণের মতো বিষয় সামনে এনে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে একটি পোস্টারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন— “আপনারা গডসেকে বিশ্বাস করেন, আর আমরা ভগৎ সিংকে বিশ্বাস করি। এটাই আপনাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য।”
নেহার এই রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাব তার কট্টর বিজেপি সমর্থক পরিবারেও পড়েছে।বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার মা পুলিশের লাঠিপেটা ও সরকারি দমন-পীড়ন নিজের চোখে দেখার পর আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। নেহা মনে করেন, ঘৃণার রাজনীতির বিপরীতে মানুষের একে অপরের হাত ধরতে শেখাই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সংহতির রাজনীতি ও জেন-জি পরিচিতি
নেহা বোরার আপসহীন অবস্থান, জ্বালাময়ী বক্তৃতা ও রাজপথের সক্রিয়তার কারণে তিনি জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তাকে তুলনা করে কে বেশি মেধাবী—এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। একজন সেখানে লেখেন, অভিজিতের চেয়ে নেহা বেশি প্রতিভাবান এবং তিনি জেন-জি প্রজন্মের আইকন। অভিজিৎ নিজেই সেই পোস্ট শেয়ার করে সহমত জানান। তবে নেহা এই প্রশংসাকে কেন্দ্র করে কোনো বিভেদ তৈরি হতে দেননি। ওই পোস্টের জবাবে তিনি লেখেন, "তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।
"থিয়েটারের সাধারণ এক কর্মী হিসেবে যাত্রা শুরু করে নেহা বোরা এখন ভারতের রাজপথে সক্রিয় এক পরিচিত মুখ। যন্তর মন্তরের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, এর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন বয়স ও রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ সেখানে যুক্ত হয়েছিলেন। চাকরি, শিক্ষা কিংবা ভোটাধিকার—যে বিষয়ই হোক না কেন, নেহার বক্তব্য অনুযায়ী, তরুণ সমাজ যদি একে অপরের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে একে অপরের জন্য লড়তে শেখে, তাহলে ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।







