সবার সংবাদ ডেস্ক:
মেহেরপুর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন রংয়ের পোশাক পরে সাইকেল চালিয়ে এই জেলার মেয়েরা ব্যাস্ত সময় পার করে। এ দৃশ্য নতুন আগন্তকদের চোখে অবাক করা হলেও স্থানীয়দের কাছে এটা নিত্য দিনের সাধারণ চিত্র। দেখা গেলো পুরুষের মোটরসাইকেলের বিপরীতে বাইসাইকেল চালিয়ে ব্যাস্ত মেয়েদের অধিকাংশই স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থী। মেহেরপুর সীমান্ত অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের নিরাপদ বাহন এখন বাইসাইকেল।
যাতায়াতের ঝামেলা এড়াতে এবং দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে অনেক শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনা থেকে বিমুখ হয়ে পড়ছিল, তখন বাইসাইকেলর প্রচলন বৃদ্ধি মেহেরপুরের নারী শিক্ষা অগ্রগতিতে প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাইকেল এখন মেয়েদের পড়াশুনার বড় অবলম্বন হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী বাইসাইকেল উপহার পাওয়ার পর তাদের দেখাদেখি এখন সকল শিক্ষার্থীদের বাহন বাইসাইকেল। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের নিরাপদ বাহন মনে করে পরিবার থেকেও কিনে দেয়া হচ্ছে বাইসাইকেল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সীমান্তবর্তী তেঁতুলবাড়িয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম থেকে আসা প্রায় ১২'শ শিক্ষার্থী বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুল, কলেজে ও প্রাইভেট পড়তে যায়। সীমান্তবর্তী এলাকার রাধাগোবিন্দপুর, করমদি, পলাশীপাড়া সহ আশপাশের অন্তত ৬ থেকে ৭টি গ্রাম রয়েছে যে গ্রামগুলোর শতভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী বাইসাইকেল ব্যবহার করে।
অথচ, একটা সময় ছিলো যখন এই সমস্ত গ্রামের বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে হতো পায়ে হেঁটে বা অটোভ্যান কিংবা আলমসাধুর মত ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে চড়ে। এতে মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হতো শিক্ষার্থীদের। তখন বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ছিলোনা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তায় তেমন গাড়িও চলতো না। ফলে, তখন সময়মত বিদ্যালয় পৌঁছাতে শিক্ষার্থীদের পড়তে হতো নানা বিড়ম্বনায়। অনেকে বিলম্বে স্কুল কলেজে পৌঁছাতো বলে তাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো। এ সমস্ত ঝামেলার কারণে তখন স্কুল কলেজ থেকে ঝরে পড়ছিল অনেকে শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে সরকারি প্রকল্পের সহায়তায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বাইসাইকেল বিতরণ করা হয়। তবে তা যতসামান্য হলেও একে অপরের দেখাদেখি এখন সব অভিভাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের কিনে দিয়েছেন বাইসাইকেল। বিভিন্ন গ্রাম থেকে সারিবদ্ধভাবে বিশেষ করে মেয়েরা বাইসাইকেল চড়ে যাতায়াত করছে বিদ্যালয়ে। একই পোষাকে মেয়েরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করায় একদিকে যেমন রাস্তার শোভাবর্ধন হচ্ছে। অন্যদিকে বিড়ম্বনা কমেছে শিক্ষার্থীদের।
প্রতিদিনের যাতায়াত ভাড়াও লাগছেনা। ফলে, পরিবেশ বান্ধব বাইসাইকেল হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও শখের একমাত্র বাহন। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে ঝড়ে পড়াদের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি নারী শিক্ষার হার ছেলেদের চাইতে বেড়ে গেছে বললেন একাধিক স্কুল কলেজের শিক্ষকবৃন্দ।
ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবস্থিত তেঁতুলবাড়িয়া ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিভিন্ন শ্রেণীতে অধ্যায়নরত সাড়ে ৫ শতাধিক নারী শিক্ষার্থী রয়েছে। ওরা এখন ছেলেদের মতোই বাইসাইকেলে যাতায়াত করে। এখন আর তাদের অটোভ্যান কিংবা আলমসাধুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়না। বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে সময়মত।
জেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই এলাকাটি অনেকটাই অবহেলিত এবং অধিকাংশ রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল ও খানাখঁন্দে ভরা। ৫/৭ কিলোমিটার দূরের শিক্ষার্থীরাও এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ৪/৫ বছর আগে ছেলেরা বাইসাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করলেও মেয়েদের ভ্যানে ও পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করতে হতো।
দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ প্রয়াসে ৫ শতাধিক মেয়েদের বাইসাইকেল কিনে দেয়া হয়। চার বছর আগে কয়েকজন ছাত্রী বাইসাইকেল নিয়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু করে। এরপর এর সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। বর্তমানে তিন থেকে চারশো ছাত্রী নিয়মিত বাইসাইকেলে যাতায়াত করে। এসব ছাত্রীরা তাদের বান্ধবীদেরকেও বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে আসতে সহায়তা করে।
বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণীর ছাত্রী রোকসানা খাতুন জানায়, আমার বাড়ি করমদী গ্রামে। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব ৫ কিলোমিটার। এক সময়ে ভ্যানে ও পায়ে হেঁটে স্কুলে চলাচল করতাম। তখন ঠিকমতো ক্লাসে উপস্থিত হতে অসুবিধা হতো। অভাবের সংসারে যাতায়াত ভাড়া যোগাড় করতে হতো অনেক কষ্ট করে। কিছুদিন পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমাকে একটি বাইসাইকেল উপহার দেন। বাড়ির আঙ্গিনায় সাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু করি। আমার দেখাদেখি আমাদের গ্রামের অনেক মেয়েরাই বাইসাইকেল কিনে আনে।
পলাশীপাড়া গ্রামের স্কুল ছাত্রী মিম আক্তার জানায়, আমাদের গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। রাস্তা ভাঙ্গাচোরা। সময়মতো ভ্যান কিংবা কোন বাহন পাওয়া যায়না। পায়ে হেঁটেই বিদ্যালয়ে যেতে হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি বাইসাইকেল উপহার পেয়ে আমি এখন নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে পারছি। ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী জুবাইদা জানায়, আমার কয়েকজন সহপাঠি বাইসাইকেল উপহার পাওয়ার পর আমার বাবা আমাকেও বাইসাইকেল কিনে দিয়েছেন। সকলে এক সাথে বিদ্যালয়ে যেতে খুব সাচ্ছন্দবোধ করি।
৯ম শ্রেণীর ছাত্রী ও খাসমহল গ্রামের এরিনা জানায়, আমাদের গ্রাম থেকে বিদ্যালয় অনেক দুরে। বিদ্যালয়ের প্রায় সকলেই বাইসাইকেল ব্যবহার করাই আমার পরিবার থেকে একটি সাইকেল দিয়েছে। সকলে মিলে একসাথে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুযোগ হয়েছে এতে আগে অনেক বখাটেরা আমাদের একা পেয়ে বিরক্ত করতো এখন আর সেই সুযোগ নেই। একত্রে অনেক জন থাকায় আমাদের দেখে বখাটে ছেলেরা কিছু বলার সাহস পায়না।
তেঁতুলবাড়ীয়া ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিসুজ্জামান জানান, ছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য চেয়ারম্যান সাহেব ও স্কুল কর্তৃপক্ষ মিলে বাইসাইকেল প্রদান করেছি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা এখন কোন বিড়ম্বনা ছাড়ায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারছে। নারীদের আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন সরকার।
এমন উদ্যোগ থেকেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বাইসাইকেল দেওয়ার উদ্যোগ নেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা বিশ্বাস। ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা বিশ্বাস জানান, তেতুলবাড়ীয়া ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪'শ টির ও বেশি গরিব মেধাবী ছাত্রীর যাতায়াতে সুবিধার জন্য সরকারি প্রকল্পে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি বাইসাইকেল দিয়েছেন।
সরকার নারী শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে। আমি সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন তেঁতুলবাড়ীয়াই শিক্ষার হার শতভাগ করতে বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। শুধু তেঁতুলবাড়িয়া নয়, নারী শিক্ষা উন্নয়নে বাইসাইকেল সহায়ক যান হয়েছে মেহেরপুরের সব উপজেলার সব গ্রামে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মাহফুজুল হোসেন জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয় প্রধান ও শিক্ষার্থীদের পরিবার থেকে নেয়া উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানায়। ওই বিদ্যালয়ে অনেক ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি। বাইসাইকেল চড়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করার সুবিধার্ধে শতভাগ উপস্থিতি হবে এমন প্রত্যাশার পাশাপাশি এমন একটি উদ্যোগকে আমি প্রশংসা করি।







